বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
ষোড়শ পাঠ: বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** শিশু কাব্যগ্রন্থ | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** বর্ষার দিনে শৈশবের স্মৃতিচারণ, লোককথা ও কল্পনার জগৎ।
—১. কবি পরিচিতি (Author Information)
**রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১):** তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ জীবনে অজস্র সাহিত্য রচনা করেছেন, যার মধ্যে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা **’কথা ও কাহিনী’, ‘সহজপাঠ’, ‘শিশু’** ও **’শিশু ভোলানাথ’** অন্যতম। ১৯১৩ সালে **’গীতাঞ্জলি’** কাব্যের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি এশিয়ার মধ্যে প্রথম **নোবেল পুরস্কার** পান। আলোচ্য কবিতাটি তাঁর **’শিশু’ কাব্যগ্রন্থে ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’** নামে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ কবিতাটি এক **বাদলা (মেঘলা) দিনে কবির শৈশবের স্মৃতিচারণ**। দিনের আলো যখন নিভে আসে এবং সূর্য ডোবে ডোবে, তখন **আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়**। মন্দিরে কাঁসর-ঘণ্টা বাজার শব্দ শোনা যায়। মেঘের খেলা দেখে কবির মনে বারবার সেই ছেলেবেলার গান ভেসে আসে: **”বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান!”**
এই মেঘলা দিনে কবির মনে মা-এর **হাসিমুখ**, **দুরন্ত খোকার** দৌরাত্মি, মেঘের ডাকে **গুরু গুরু বুক**, এবং ঘরের কোণে **মিটি মিটি আলোয়** শোনা **সুয়োরানি-দুয়োরানি** ও **কঙ্কাবতীর** গল্পের কথা মনে পড়ে। কবির মনে প্রশ্ন জাগে, **শিবঠাকুরের বিয়েতে**ও কি এমন মেঘের ঘটা ছিল? শেষে তিনি ভাবেন, সেই গানটি কোন ছেলে বা মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর জন্য কোনো এক নদীর ধারে, কোনো এক দেশে গেয়েছিল।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **সুয্যি** | সূর্য (অঞ্চল ভেদে ব্যবহৃত রূপ) | দিনের আলো নিভে এল, **সুয্যি** ডোবে ডোবে। |
| **মানিক** | মূল্যবান রত্ন, চুনি | মেঘের মাথায় **একশো মানিক** জ্বালা। |
| **বাদলা** | মেঘলা, বর্ষার দিন | **বাদলা** হাওয়ায় কবির ছেলেবেলার গান মনে পড়ে। |
| **বান** | বন্যা, নদীর জল বেড়ে যাওয়া | গানটিতে **নদেয় এল বান** কথাটি রয়েছে। |
| **দৌরাত্মি** | দুরন্তপনা, দুষ্টুমি | খোকার **দৌরাত্মি** না যায় লেখাজোকা। |
| **সৃষ্টি** | পৃথিবী, জগৎ | মেঘ ডেকে ওঠে, **সৃষ্টি** ওঠে কাঁপি। |
| **দস্যি** | দুরন্ত, দুষ্টু, চঞ্চল | **দস্যি** ছেলে গল্প শোনে চুপ করে। |
| **কঙ্কাবতী** | ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা এক উপন্যাসের চরিত্র (রূপকথা) | কবির মনে অভিমানী **কঙ্কাবতীর** ব্যথা মনে পড়ে। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. বৃষ্টির দিনে আকাশের কেমন বর্ণনা দেওয়া হয়েছে?
বৃষ্টির দিনে **দিনের আলো নিভে আসে** এবং **সূর্য ডোবে ডোবে**। আকাশ **মেঘে ঢেকে যায়** এবং মেঘের উপর মেঘ জমে **রঙের উপর রং** তৈরি করে। মেঘের মাথায় যেন **একশো মানিক জ্বালা**।
২. বৃষ্টির দিনে কবির মনে কোন গান ভেসে আসে?
বৃষ্টির দিনে কবির মনে বারবার সেই ছেলেবেলার গান ভেসে আসে: **”বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান!”**
৩. ‘একশো মানিক জ্বালা’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
**’মানিক’** মানে মূল্যবান রত্ন। মেঘের মাঝে যখন ঘন ঘন **বিদ্যুৎ চমকায়** বা **বৃষ্টির কণাগুলো** উজ্জ্বল দেখায়, তখন মনে হয় যেন মেঘের মাথায় **অসংখ্য মূল্যবান রত্ন** ঝলমল করে জ্বলছে।
৪. মেঘের খেলা দেখে কবির মনে কী কী খেলা পড়ে যায়?
মেঘের খেলা দেখে কবির মনে **কত দিনের লুকোচুরি** এবং **কত ঘরের কোণের** খেলার কথা মনে পড়ে যায়। মেঘ যেমন দেশে দেশে খেলে বেড়ায়, তেমনই ছোটোবেলায় কবিও খেলা করতেন।
৫. ছেলেবেলায় কবির মনে মেঘের ডাক কী প্রভাব ফেলত?
ছেলেবেলায় মেঘের ডাকে কবির **গুরু গুরু বুক** করত, অর্থাৎ তাঁর মনে **ভয় ও শিহরণ** জাগত।
৬. বৃষ্টির দিনে ঘরের কোণের পরিবেশ কেমন ছিল?
বৃষ্টির দিনে ঘরের কোণে **মিটি মিটি আলো** জ্বলত এবং চারিদিকে দেয়ালে **ছায়া কালো কালো** দেখাত। বাইরে কেবল জলের **ঝুপঝুপ** শব্দ শোনা যেত।
৭. সুয়োরানি-দুয়োরানির কথা কখন মনে পড়েছিল?
বাদলা দিনে মায়ের মুখে শোনা সেই **সুয়োরানি-দুয়োরানি** (লোককথা) এবং **অভিমানী কঙ্কাবতীর ব্যথার** কথা কবির মনে পড়েছিল। এই গল্পগুলো বৃষ্টিমুখর দিনে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠত।
৮. ‘নদেয় এল বান’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
**’বান’** শব্দের অর্থ **বন্যা** বা নদীর জল বেড়ে যাওয়া। অর্থাৎ, টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ার ফলে নদীর জল বেড়ে গেছে বা নদী ছাপিয়ে বন্যা এসেছে—এই অবস্থাকেই বোঝানো হয়েছে।
৯. শিবঠাকুরের বিয়ের কথা কবির কেন মনে পড়েছিল?
শিবঠাকুরের বিয়ের কাহিনিটি একটি **পুরাতন লোককথা**। বৃষ্টির দিনে মেঘের ঘটা দেখে কবির মনে প্রশ্ন জাগে যে, শিবঠাকুরের বিয়েতেও কি **এমনই মেঘের ঘনঘটা** এবং **বিজুলির হানা** ছিল?
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ কবিতায় বাদলা দিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ কেমনভাবে ফুটে উঠেছে?
কবিতায় বাদলা দিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ একযোগে **সৌন্দর্য ও গভীরতা** এনেছে:
- **আকাশের দৃশ্য:** দিনের আলো নিভে আসে, সূর্য ডোবে ডোবে। আকাশ **কালো মেঘে ঢেকে** যায়। মেঘের উপর মেঘ জমে **রঙের উপর রং** তৈরি করে এবং মেঘের মাথায় যেন **একশো মানিক জ্বালা** দেখা যায়।
- **শব্দ ও গতি:** বাইরে কেবল জলের **ঝুপঝুপ শব্দ** শোনা যায়। মেঘেরা যেন কোনো **সীমানা না মেনে দেশে দেশে খেলে** বেড়ায়।
- **প্রভাব:** এই মেঘের খেলায় নতুন ফুলের বনে বৃষ্টি ঝরে যায়, যা **প্রকৃতিকে সজীব** করে তোলে। মেঘের ডাকে **সৃষ্টি** (পৃথিবী) ওঠে কাঁপে।
এইভাবে কবিতাটি বর্ষার দিনে প্রকৃতির **বহুমুখী ও প্রাণময়** চিত্র তুলে ধরেছে।
২. বৃষ্টির দিনে কবির মনে কোন কোন শৈশবের স্মৃতি ভিড় করে আসে?
বাদলা দিনে কবির মনে শৈশবের অনেক মিষ্টি স্মৃতি ভিড় করে আসে:
- **পরিবার:** তাঁর **মায়ের হাসিমুখ** এবং **দুরন্ত ছোটো ভাই** (খোকা)-এর দৌরাত্মির কথা মনে পড়ে। মেঘের ডাকে তাঁর বুক **গুরু গুরু** করত।
- **লোককথা:** মা-এর কাছে শোনা **সুয়োরানি-দুয়োরানি** এবং **অভিমানী কঙ্কাবতীর ব্যথার** মতো লোককথা ও রূপকথার গল্প মনে পড়ে।
- **ঘরের পরিবেশ:** ঘরের কোণে **মিটি মিটি আলো** এবং দেয়ালে **ছায়া কালো কালো**—এই নিবিড় পরিবেশের স্মৃতি মনে আসে।
- **গান:** সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ছেলেবেলার গান: **”বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান!”**
বৃষ্টির আগমন কবির মনে **নিরাপত্তা, স্নেহ ও কল্পনার জগতের** দ্বার খুলে দেয়।
৩. মেঘকে কেন ‘দেশের সীমানা না মানা’ বলা হয়েছে? মেঘের খেলা কবির মনে কীসের আভাস দেয়?
মেঘকে **’দেশের সীমানা না মানা’** বলা হয়েছে, কারণ:
- **মুক্তির প্রতীক:** মেঘেরা **স্বাধীন ও বাঁধনহীন**। তারা পৃথিবীর কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা নিয়ম (মানা) না মেনে **দেশে দেশে খেলে বেড়ায়**।
- **সৃষ্টিশীলতা:** তারা **পলে পলে নতুন খেলা** খুঁজে পায় এবং **নতুন ফুলের বনে বৃষ্টি** দিয়ে যায়। এটি প্রকৃতির **সৃষ্টিশীল ও অবাধ রূপকে** তুলে ধরে।
**আভাস:** মেঘের এই খেলা কবির মনে শৈশবের **লুকোচুরি খেলার** স্মৃতি এবং **বাঁধন ভাঙা স্বাধীনতার** আভাস এনে দেয়। মেঘের এই অবাধ গতি কবিকে যেন মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনও এরকমই **মুক্ত, চঞ্চল ও আনন্দময়** হওয়া উচিত।