ষষ্ঠ পাঠ: ওরে গৃহবাসী (নোট)
প্রসেসিং হচ্ছে…

বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)

ষষ্ঠ পাঠ: ওরে গৃহবাসী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) – নোটস ও উত্তর

**উৎস:** গীতবিতান (প্রকৃতি পর্যায়, দোল) | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** বসন্তের আগমন, জড়তা ভেঙে বাইরে আসার আহ্বান।

১. কবি পরিচিতি (Poet Information)

**রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১):** বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার, সুরকার ও কবি। তিনি দীর্ঘ জীবনে অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর রচিত গানগুলি **’গীতবিতান’** এবং স্বরলিপিগুলি **’স্বরবিতান’** নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। ‘ওরে গৃহবাসী’ গানটি তাঁর ‘গীতবিতান’-এর **’প্রকৃতি’ পর্যায়ভুক্ত** এবং এটি **’দোল’ (বসন্ত)** উৎসবের গান। ১৯১৩ সালে তিনি এশিয়ার মধ্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

২. সারসংক্ষেপ (Summary)

‘ওরে গৃহবাসী’ গানটি মূলত **বসন্তের আগমন ও দোল উৎসবের** প্রেক্ষাপটে রচিত। কবি ঘরের ভেতরের **জড়তা ও আলস্য** ছেড়ে সকলকে **বাইরের প্রকৃতিতে** বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বসন্তের **’দোল’** আজ শুধুমাত্র ঘরে নয়, **স্থলে, জলে, বনতলে**—সর্বত্র লেগেছে।

বসন্তের আগমনে প্রকৃতিতে উৎসব শুরু হয়েছে: **অশোকে-পলাশে** **রাঙা হাসি রাশি রাশি** দেখা যাচ্ছে। প্রভাতের আকাশে **রাঙা নেশা** মেশা মেঘের ছায়া পড়েছে এবং নতুন পাতায় **রাঙা হিল্লোল** লেগেছে। দখিন বাতাসের প্রভাবে **বেণুবন** (বাঁশবন) মর্মর ধ্বনি তুলছে। প্রজাপতি ও মৌমাছিরা ফুলের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মৌমাছি তার পাখা বাজিয়ে **ভিখারির বীণা** বাজাচ্ছে। মাধবীবিতানে বাতাস **গন্ধে বিভোল** (বিভোর) হয়ে উঠেছে। তাই কবি বার বার অনুরোধ করেছেন, ‘দ্বার খোল্, দ্বার খোল্’।

৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)

বাংলা শব্দ অর্থ প্রাসঙ্গিকতা
**গৃহবাসী** যারা ঘরের মধ্যে বাস করে, গৃহের আলস্যে থাকা মানুষজন কবি **গৃহবাসীদের** দোল উৎসবে যোগ দিতে ডেকেছেন।
**দোল** বসন্ত উৎসব, হোলি (এখানে আনন্দের স্পন্দন) প্রকৃতির সর্বত্র **দোল** লেগেছে।
**রাঙা হাসি** লাল রঙের আভা (ফুল ফোটার প্রতীক) অশোকে-পলাশে **রাঙা হাসি** রাশি রাশি।
**হিল্লোল** ঢেউ, তরঙ্গ, স্পন্দন নবীন পাতায় **রাঙা হিল্লোল** লেগেছে।
**বেণুবন** বাঁশবন দখিন বাতাসে **বেণুবন** মর্মর ধ্বনি তোলে।
**দখিনা** দক্ষিণ দিকের বাতাস, এখানে দক্ষিণা বা দানও হতে পারে বসন্তে **দখিন বাতাসে** প্রকৃতি চঞ্চল।
**মাধবীবিতান** মাধবী লতার সমারোহ বা কুঞ্জ মাধবীলতা ঘেরা স্থানে বাতাস **গন্ধে বিভোল**।
**বিভোল** বিহ্বল, বিভোর, মগ্ন বায়ু **গন্ধে বিভোল**।

৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)

(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):

১. কবি কাদের ‘গৃহবাসী’ বলে সম্বোধন করেছেন? [১ নম্বর]

কবি সেই সমস্ত মানুষদের **’গৃহবাসী’** বলে সম্বোধন করেছেন, যারা বসন্তের উৎসবের দিনেও ঘরের ভেতরে আলস্যে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে এবং বাইরের প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছে না।

২. ‘দোল’ কোথায় কোথায় লেগেছে? [২ নম্বর]

বসন্তের উৎসব ‘দোল’ শুধু মানুষের মনে নয়, **স্থলে, জলে ও বনতলে**—অর্থাৎ প্রকৃতির সর্বত্রই লেগেছে।

৩. বসন্তে কোন কোন গাছে ‘রাঙা হাসি রাশি রাশি’ দেখা যায়? [২ নম্বর]

বসন্তে **অশোক** ও **পলাশ** গাছে ফুল ফোটার মাধ্যমে **’রাঙা হাসি রাশি রাশি’** দেখা যায়। এই ফুলগুলি বসন্তের প্রতীক।

৪. প্রভাত-আকাশে কীসের নেশা লেগেছে? [১ নম্বর]

বসন্তের সকালে প্রভাত-আকাশে **রাঙা নেশা** মেশা মেঘের ছায়া লেগেছে।

৫. দখিন বাতাসের প্রভাবে প্রকৃতিতে কী কী পরিবর্তন দেখা যায়? [২ নম্বর]

দখিন বাতাসের প্রভাবে **বেণুবন মর্মর** ধ্বনি তোলে, **প্রজাপতি** ঘাসে ঘাসে দোলে এবং **মাধবীবিতানে** বায়ু গন্ধে বিভোর হয়ে ওঠে।

৬. মৌমাছিকে কেন ‘ভিখারি’ বলা হয়েছে? [২ নম্বর]

মৌমাছি ফুলের কাছে **মধু ভিক্ষা** করে বা সংগ্রহ করতে আসে। এই কারণে এবং তার পাখার শব্দকে বীণার শব্দের সঙ্গে তুলনা করে কবি তাকে **’ভিখারির বীণা’** বাজানো **’ভিখারি’** হিসেবে কল্পনা করেছেন।

৭. ‘দ্বার খোল্, দ্বার খোল্’— এই আহ্বান বার বার কেন করা হয়েছে? [২ নম্বর]

বসন্তের **অমোঘ ও সর্বজনীন আহ্বানকে** আরও জোরদার করার জন্য এবং ঘরের ভেতরের **আলস্য ভেঙে** প্রকৃতিকে উপভোগ করার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য কবি এই কথাটি বারবার বলেছেন।

৮. ‘রাঙা হিল্লোল’ কোথায় লেগেছে? এই হিল্লোল বলতে কী বোঝানো হয়েছে? [২ নম্বর]

**’রাঙা হিল্লোল’** **নবীন পাতায়** লেগেছে। এখানে হিল্লোল বলতে বসন্তের স্পর্শে নতুন পাতায় আসা **রঙিন স্পন্দন, চঞ্চলতা** বা **দোলা**-কে বোঝানো হয়েছে।

৯. ‘মউমাছি ফিরে যাচি ফুলের দখিনা’— এই অংশটির অর্থ বিশ্লেষণ করো। [২ নম্বর]

এখানে মৌমাছিরা ফুলের কাছে **মধু (মউ)** ভিক্ষা (যাচি) করছে। দখিনা শব্দের অর্থ হলো **দান বা দক্ষিণা**। অর্থাৎ, মৌমাছি ফুলকে তার সেবা বা পরাগমিলনের বিনিময়ে যেন মধু রূপী দক্ষিণা চাইছে।

রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):

১. ‘ওরে গৃহবাসী’ গানে বসন্তের আগমনে প্রকৃতির যে আনন্দময় চিত্র ফুটে উঠেছে, তা আলোচনা করো। [৫ নম্বর]

রবীন্দ্রনাথের এই গানে বসন্তের আগমন এক **প্রবল উৎসবের বার্তা** নিয়ে এসেছে:

  • **রঙের ছড়াছড়ি:** বসন্তের প্রতীক **অশোক ও পলাশ** ফুলে **’রাঙা হাসি রাশি রাশি’** দেখা যায়। প্রভাত-আকাশে মেঘে মেশা **’রাঙা নেশা’** লেগেছে।
  • **আলোর স্পন্দন:** নতুন পাতায় **’রাঙা হিল্লোল’** বা রঙের দোলা লেগেছে।
  • **শব্দ ও গন্ধ:** **দখিন বাতাসে বেণুবন** মর্মর ধ্বনি তোলে। **মাধবীবিতান** থেকে আসা ফুলের গন্ধে বাতাস **বিভোর** (বিভোল) হয়ে ওঠে।
  • **জীবনের গতি:** **প্রজাপতি** ঘাসে ঘাসে দুলছে এবং **মৌমাছি** ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহ করছে।

এইভাবে বসন্তের আগমন প্রকৃতিতে **আনন্দ, চঞ্চলতা ও প্রাণের স্পন্দন** এনেছে, যা এক সম্পূর্ণ আনন্দময় চিত্র সৃষ্টি করে।

২. ‘ওরে গৃহবাসী, খোল্, দ্বার খোল্’— কবি কেন বারবার ঘরের দরজা খোলার আহ্বান জানিয়েছেন? [৫ নম্বর]

কবি বারবার ঘরের দরজা খোলার আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ:

  1. **আলস্য ত্যাগ:** ঘরের ভেতরের জীবন **আলস্য ও জড়তার** প্রতীক। কবি চান মানুষ যেন এই জড়তা ত্যাগ করে বাইরের **জীবনের উৎসবে** যোগ দিক।
  2. **প্রকৃতির আহ্বান:** বসন্তের **’দোল’** বা আনন্দের স্পন্দন প্রকৃতিতে **সর্বত্র** (স্থলে, জলে, বনতলে) লেগেছে। ঘরের দরজা বন্ধ থাকলে মানুষ এই **সর্বজনীন আনন্দ** থেকে বঞ্চিত হবে।
  3. **জীবনের পূর্ণতা:** বসন্ত হলো সৃষ্টির ও নতুনত্বের প্রতীক। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলে মানুষ **জীবনের পূর্ণতা ও সার্থকতা** খুঁজে পাবে।

তাই, দরজা খোলার আহ্বানটি কেবল ভৌত দরজা খোলার আহ্বান নয়, এটি মানুষের **মন ও চেতনার দরজা খোলার** আহ্বান।

৩. গানে বসন্তের যে দুটি ফুলের উল্লেখ আছে, তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লেখো। [৫ নম্বর]

গানে বসন্তের দুটি প্রধান ফুলের উল্লেখ রয়েছে: অশোক ও পলাশ।

  • **অশোক (Ashoka):**
    • **বৈশিষ্ট্য:** অশোক ফুল মূলত কমলা-লাল রঙের হয় এবং বসন্তে এই ফুল ফোটে। এই ফুল প্রাচীনকাল থেকেই **প্রেম ও সৌন্দর্যের** প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
    • **ভূমিক:** এই ফুলে **’রাঙা হাসি রাশি রাশি’** দেখা যায়, যা বসন্তের সৌন্দর্যকে মহিমান্বিত করে।
  • **পলাশ (Flame of the Forest):**
    • **বৈশিষ্ট্য:** পলাশ ফুল গাঢ় লাল বা সিঁদুরে রঙের হয়। বসন্তে যখন পলাশ ফোটে, তখন মনে হয় যেন গাছে আগুন লেগেছে।
    • **ভূমিক:** পলাশও অশোকের সঙ্গে মিলে বসন্তের আগমনের **লাল রঙ ও আনন্দের প্রতীক** হিসেবে কাজ করে।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu