বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
সপ্তদশ পাঠ: বোকা কুমিরের কথা (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** টুনটুনির বই | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** চালাকের চাতুরি এবং মূর্খের লোভের ফল।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫):** তিনি ছিলেন বাংলার শিশু-কিশোর সাহিত্যের অন্যতম প্রধান রূপকার। তাঁর জন্ম ময়মনসিংহে। তিনি একাধারে লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার এবং মুদ্রণ শিল্পের পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি মূলত ছোটোদের জন্য **উপন্যাস, গল্প ও ছড়া** রচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে—**’ছেলেদের রামায়ণ’, ‘ছেলেদের মহাভারত’, ‘টুনটুনির বই’** এবং **’সেকালের কথা’**। তিনি **’সন্দেশ’** পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। আলোচ্য গল্পটি তাঁর রচিত **’টুনটুনির বই’** গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
গল্পটি একটি **বোকা কুমির** এবং একটি **চালাক শিয়ালের** যৌথ চাষের কাহিনি। কুমির সবসময় শিয়ালকে ঠকাতে চেয়েছিল, কিন্তু শিয়ালের বুদ্ধির কাছে সে প্রতিবারই পরাজিত হয়।
১. **আলু চাষ:** আলু হয় মাটির নীচে। কুমির ভাবে আলু গাছের ফল। শিয়ালকে ঠকাতে সে **গাছের আগা (উপরের অংশ)** চায়। কুমির আগা নিয়ে দেখে তাতে আলু নেই। শিয়াল মাটির নিচ থেকে আলু তুলে নিয়ে যায়।
২. **ধান চাষ:** এবার কুমির ঠিক করে আগা নয়, **গোড়া (শিকড়)** চাইবে। ধান হয় আগার দিকে। শিয়াল গোড়া কুমিরকে দিয়ে ধানসুদ্ধ গাছের আগা কেটে নেয়। কুমির মাটি খুঁড়ে শুধু শিকড় পায়।
৩. **আখের চাষ:** কুমির এবার প্রতিজ্ঞা করে **আগা না নিয়ে ছাড়বে না**। আখ মিষ্টি হয় গোড়ার দিক থেকে। শিয়াল তাকে আগাগুলো দিয়ে নিজে আখগুলো নিয়ে যায়। কুমির আখের আগা চিবিয়ে দেখে শুধু **নোনতা (লবণাক্ত)**।
তিনবার ঠকে যাওয়ার পর কুমির রাগ করে শিয়ালকে বলে, তার সঙ্গে সে আর চাষ করতে যাবে না। গল্পটি বোকা কুমিরের **অজ্ঞানতা** এবং চালাক শিয়ালের **বুদ্ধিমত্তাকে** তুলে ধরেছে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **আগাবা** | গাছের ওপরের অংশ বা ডগা | আলু চাষে কুমির **আগা** চেয়েছিল। |
| **গোড়া** | গাছের শিকড় বা নিচের অংশ | ধান চাষে কুমির **গোড়া** চেয়েছিল। |
| **খড়** | শুকনো ধান গাছ, বিচালি | ধান চাষে গোড়া নিয়ে কুমিরের শুধু **খড়** লাভ হলো। |
| **আখ** | ইক্ষু (যার থেকে চিনি তৈরি হয়) | শেষবার কুমির ও শিয়াল **আখের** চাষ করেছিল। |
| **নোনতা** | লবণাক্ত স্বাদযুক্ত | আখের আগা চিবিয়ে কুমিরের কাছে **নোনতা** লাগল। |
| **বড্ড** | খুব, অত্যন্ত | তিনবার ঠকে কুমির শিয়ালকে বলল, ‘তুমি **বড্ড** ঠকাও!’ |
| **কপাল** | ভাগ্য, অদৃষ্ট | ধান চাষে ঠকে কুমির বলল, ‘হায় **কপাল**!’ |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. কুমির কেন শিয়ালকে ঠকাতে চেয়েছিল?
কুমির ছিল **বোকা**, কিন্তু সে নিজেকে ** চালাক** মনে করত। শিয়ালকে ঠকিয়ে চাষের বেশিরভাগ অংশ একাই নিয়ে যাওয়ার **লোভ** তার ছিল।
২. আলু চাষে কুমির কীভাবে ঠকে গেল?
আলু হয় মাটির নিচে। কুমির **আলুকে গাছের ফল** ভেবে **’আগা’** চেয়েছিল। শিয়াল তাকে আগা দিলে, তাতে কোনো আলু ছিল না। শিয়াল মাটি খুঁড়ে আলু নিয়ে গেলে কুমির ঠকে যায়।
৩. দ্বিতীয়বার চাষের আগে কুমির কী প্রতিজ্ঞা করেছিল? এর ফল কী হলো?
দ্বিতীয়বার চাষের আগে কুমির প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, সে আর আগার দিক নেবে না, এবার সে **’গোড়ার দিক’** নেবে। এর ফল হলো—ধান যেহেতু গাছের আগার দিকে হয়, তাই গোড়া নিয়ে কুমির শুধু **শিকড় ও খড়** পেল।
৪. আখ চাষে কুমির কেন খুশি হয়েছিল? তার খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না কেন?
আখ চাষে কুমির ভেবেছিল, এবার সে আগা না নিয়ে ছাড়বে না। সে আগাগুলো পেয়ে খুশি হয়েছিল। কিন্তু আখের আগা চিবিয়ে দেখল, তা **মিষ্টি নয়, শুধু নোনতা**। আখ থাকে গোড়ার দিকে, তাই তার খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
৫. তিনবার ঠকে যাওয়ার পর কুমির শিয়ালকে কী বলেছিল?
তিনবার ঠকে যাওয়ার পর কুমির রাগে শিয়ালকে বলেছিল: **”না ভাই, তোমার সঙ্গে আর আমি চাষ করতে যাব না, তুমি বড্ড ঠকাও!”**
৬. আলু, ধান ও আখ—এই তিনটি ফসলের মধ্যে কোনগুলো মাটির উপরে ও নিচে হয়?
১. **আলু:** মাটির **নীচে** হয়। ২. **ধান:** মাটির **উপরে** হয়। ৩. **আখ:** মাটির **উপরে** মিষ্টি হয় (গোড়ার দিকে)।
৭. কুমির বারবার কেন ঠকতে গেল?
কুমির ছিল **বোকা, অজ্ঞ ও অতিরিক্ত লোভী**। ফসলের প্রকৃতি সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান ছিল না। সে শিয়ালকে **প্রতিবারই ঠকাতে চেয়েছিল**, কিন্তু ভুল নির্বাচন করার কারণে নিজেই প্রতিবার ঠকে যায়।
৮. ‘হায় কপাল! মাটি খুঁড়ে দেখে সেখানে কিছু নেই।’— এখানে কার কপাল খারাপের কথা বলা হয়েছে? কেন এমন হলো?
এখানে **কুমিরের** কপাল খারাপের কথা বলা হয়েছে। ধান চাষে সে **গোড়ার দিক** নিয়েছিল। ধান মাটির উপরে ফলে। ফলে গোড়া খুঁড়ে কুমির কিছুই পেল না।
৯. শিয়াল কীভাবে চাষের অংশ ভাগ করার সময় কুমিরকে রাজি করাত?
কুমির যখনই কোনো অংশ (আগা বা গোড়া) দাবি করত, শিয়াল তখন হেসে বলত, **”আচ্ছা, তাই হবে!”** শিয়াল এই কথা বলে কুমিরকে সহজে রাজি করিয়ে দিত, কারণ সে জানত কুমির সবসময় ভুল অংশটিই বেছে নেবে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘বোকা কুমিরের কথা’ গল্পে কুমির কীভাবে শিয়ালের কাছে তিনবার ঠকে গেল, তার বর্ণনা দাও।
কুমির ছিল লোভী ও বোকা। সে তিনবারই শিয়ালের কাছে ঠকে যায়:
- **আলু চাষ (ভুল আগা নির্বাচন):** আলু মাটির নিচে হয়। কুমির আগা চাইলে শিয়াল তাকে **অকেজো গাছের আগা** দিয়ে দেয়।
- **ধান চাষ (ভুল গোড়া নির্বাচন):** প্রথমবার ঠকে কুমির এবার **গোড়া** চায়। ধান আগার দিকে হয়। তাই কুমির শুধু **শিকড় ও খড়** পায়।
- **আখের চাষ (আবার ভুল আগা):** কুমির এবার জেদ করে **আগা** চায়। আখ মিষ্টি হয় গোড়ার দিকে। তাই আগা নিয়ে কুমির দেখে তা শুধু **নোনতা**।
কুমির ফসলের প্রকৃতি সম্পর্কে **অজ্ঞ** ছিল এবং শিয়াল চালাকি করে সেই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রতিবারই লাভবান হয়।
২. ‘বোকা কুমিরের কথা’ গল্পে শিয়ালের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
এই গল্পে শিয়াল হলো **চালাকি, বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্য্যের প্রতীক**।
- **চালাক ও কৌশলী:** শিয়াল কুমিরের **অজ্ঞতা ও লোভকে** কাজে লাগিয়েছিল। কুমির যখনই কোনো অংশ (আগা বা গোড়া) দাবি করেছে, শিয়াল তখনই হেসে তা মেনে নিয়েছে, কারণ সে জানত কুমির ভুল করবে।
- **ধৈর্য্যশীল:** কুমির বারবার অংশ পরিবর্তন করার পরেও শিয়াল **ধৈর্য্য হারায়নি**। সে স্থির ছিল যে, ফসল যাই হোক না কেন, কুমিরের লোভ ও বোকামির সুযোগ নিয়ে সে লাভবান হবে।
- **বাস্তব জ্ঞান:** শিয়ালের **ফসলের প্রকৃতি (আলু নিচে, ধান উপরে, আখ গোড়ায় মিষ্টি)** সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ছিল, যা কুমিরের ছিল না। এই বাস্তব জ্ঞানই তার বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি।
শিয়ালের এই চতুরতাই তাকে কুমিরের সঙ্গে তিন-তিনবার চাষে জয়ী করে তোলে।
৩. গল্পটির নামকরণ ‘বোকা কুমিরের কথা’ কতখানি সার্থক, তা তোমার যুক্তিসহ আলোচনা করো।
গল্পটির নামকরণ **’বোকা কুমিরের কথা’** সম্পূর্ণ সার্থক হয়েছে।
- **কেন্দ্রীয় চরিত্র:** গল্পের মূল চালিকাশক্তি কুমির। তার **অজ্ঞানতা, লোভ ও বোকা সিদ্ধান্তগুলোই** গল্পের সমস্ত ঘটনা তৈরি করেছে।
- **শিক্ষার ভিত্তি:** গল্পটির শেষে যে নীতিশিক্ষাটি দেওয়া হয়, তা কুমিরের **বোকামির পরিণতি**। কুমির যদি বোকা না হতো এবং ফসলের জ্ঞান রাখত, তবে শিয়াল তাকে ঠকাতে পারত না।
- **আকর্ষণ:** নামকরণটি পাঠককে সরাসরি বলে দেয় যে, এই গল্পটি একটি **কৌতুকপূর্ণ (Fable)** আখ্যান, যেখানে একটি বোকা প্রাণীর কাহিনি বলা হবে।
গল্পে কুমিরের বারবার ঠকে যাওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে, **কুমিরই গল্পের মূল শিক্ষা ও হাস্যরসের উৎস**। তাই তার চরিত্রকে কেন্দ্র করে নামকরণটি সার্থক।