বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
চতুর্দশ পাঠ: মায়াতরু (অশোকবিজয় রাহা) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** ভানুমতীর মাঠ কাব্যগ্রন্থ | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** প্রকৃতির উপর আলো, অন্ধকার ও ঋতুর প্রভাব এবং কল্পনাবিলাস।
—১. কবি পরিচিতি (Author Information)
**অশোকবিজয় রাহা (১৯১০-১৯৯০):** তাঁর জন্ম বাংলাদেশের শ্রীহট্টে। তিনি ছিলেন কবি ও প্রাবন্ধিক। নদী, পাহাড়, অরণ্যপ্রকৃতি ছিল তাঁর কবিতার কেন্দ্রভূমি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো—**’ভানুমতীর মাঠ’**, **’রুদ্রবসন্ত’** এবং **’জলডম্বুর পাহাড়’**। আলোচ্য **’মায়াতরু’** কবিতাটি তাঁর **’ভানুমতীর মাঠ’** কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘মায়াতরু’ কবিতাটি এক **জাদুকরী গাছের** (মায়াতরু) কথা বলে, যার রূপ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়।
১. **সন্ধ্যা:** সন্ধ্যা হলেই গাছটি **দু’হাত তুলে ভূতের নাচ** শুরু করে। ২. **চাঁদ ও ভালুক:** বনের মাথায় যখন **চাঁদ** ওঠে, তখন গাছটি রূপ নেয় **ঘাড় ফুলানো ভালুকের**। ৩. **বৃষ্টি:** বৃষ্টি এলেই গাছটির যেন **কম্প দিয়ে জ্বর** আসে (অর্থাৎ বৃষ্টিতে পাতা কাঁপতে থাকে)। ৪. **বৃষ্টি শেষে চাঁদ:** এক পশলা বৃষ্টির শেষে যখন চাঁদ হেসে ওঠে, তখন সেই ভালুক বা ভূত কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। গাছটিতে তখন **লক্ষ হীরার মাছ** ঝাঁক বেঁধে **মুকুট** পরিয়ে দেয়। ৫. **ভোর:** ভোরবেলাকার **আবছায়াতে** সেই মাছেরা উধাও হয়ে যায়। সকালে শুধু পড়ে থাকে **ঝিকিরমিকির আলোর রূপালি এক ঝালর**। এই অদ্ভুত পরিবর্তনশীল রূপের কারণেই গাছটিকে **’মায়াতরু’** বলা হয়েছে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **মায়াতরু** | মায়াবী গাছ, জাদুকরী গাছ | যে গাছটি নানা রূপে বদলে যায়। |
| **পশলা** | এক দফায় বৃষ্টি, বর্ষণ | এক **পশলা** বৃষ্টির শেষে চাঁদ উঠত। |
| **কম্প** | কাঁপুনি, থরথর করে কাঁপা | বৃষ্টি হলেই গাছটির **কম্প** দিয়ে জ্বর আসত। |
| **ঝিলিক** | তীব্র কিন্তু ক্ষণস্থায়ী আলোর ছটা, চমক | বনের মাথায় চাঁদ **ঝিলিক** মেরে উঠত। |
| **আবছায়া** | অস্পষ্ট, আবছা ছায়ার মতো অন্ধকার | **ভোরবেলাকার আবছায়াতে** কাণ্ড হতো। |
| **ঝালর** | যা ঝলমল করে ঝুলতে থাকে, পর্দা | সকালে **রূপালি এক ঝালর** পড়ে থাকত। |
| **ঝাঁক** | দল, পাল, ভিড় | লক্ষ হীরার মাছ **ঝাঁক** বেঁধেছিল। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. দিনের কোন সময়ে মায়াতরু ‘ভূতের নাচ’ শুরু করত?
গাছটি **সন্ধে হলেই** (অন্ধকার শুরু হলেই) তার **দু’হাত (ডাল) তুলে** **ভূতের নাচ** শুরু করত।
২. মায়াতরু কখন ‘ভালুক’ হয়ে যেত? তার স্বভাব কেমন হতো?
**বনের মাথায় যখন চাঁদ উঠত**, তখন গাছটি ভালুক হয়ে যেত। ভালুক হয়ে সে **ঘাড় ফুলিয়ে গর্ গর্** করে শব্দ করত।
৩. কখন মায়াতরুর ‘কম্প দিয়ে জ্বর’ আসত? এই কথাটির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
**বিষ্টি এলেই** মায়াতরুর **কম্প দিয়ে জ্বর** আসত। এর দ্বারা কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বৃষ্টির জলের প্রভাবে গাছের পাতা ও ডালপালা **ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপতে** শুরু করত।
৪. বৃষ্টির শেষে চাঁদ উঠলে গাছটি কী রূপে সজ্জিত হতো?
এক পশলা বৃষ্টির শেষে যখন চাঁদ হেসে উঠত, তখন গাছটিতে **লক্ষ হীরার মাছ** ঝাঁক বেঁধে এসে যেন তাকে **মুকুট** পরিয়ে দিত।
৫. ভোরবেলাকার কাণ্ডটি কেমন ছিল?
**ভোরবেলাকার আবছায়াতে** সেই লক্ষ হীরার মাছ কোথায় যেন উধাও হয়ে যেত। সকাল হলে শুধু পড়ে থাকত **ঝিকিরমিকির আলোর রূপালি এক ঝালর**।
৬. ‘লক্ষ হীরার মাছ’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
এক পশলা বৃষ্টির পর গাছের পাতায় **অনেকগুলো জলের বিন্দু** লেগে থাকত। যখন চাঁদ এই বিন্দুগুলোর উপর আলো ফেলত, তখন বিন্দুগুলি **হীরার মতো উজ্জ্বল** এবং মাছের মতো **ঝলমলে** দেখাত। কবি কল্পনায় এদেরই **’লক্ষ হীরার মাছ’** বলেছেন।
৭. মায়াতরুকে কেন ‘মুকুট’ পরানো হয়েছিল?
বৃষ্টির শেষে চাঁদের আলোয় জলের বিন্দুগুলি যখন **লক্ষ হীরার মাছের** মতো জ্বলজ্বল করত, তখন সেই **আলোকময় রূপালি বিন্দুগুলোর ঝাঁক** গাছের মাথায় যেন এক **শোভাময় মুকুটের** মতো দেখাত।
৮. ‘কোথায় বা সেই ভালুক গেল, কোথায় বা সেই গাছ’— কেন কবি এমন বলেছেন?
কবি এমন বলেছেন কারণ গাছের রূপের **তাৎক্ষণিক পরিবর্তন** ঘটেছে। এক মুহূর্ত আগেও গাছটি ভালুকের মতো ছিল, কিন্তু বৃষ্টির শেষে চাঁদের আলো আসতেই সেটি **জাদুকরী রূপালি মাছে** পরিবর্তিত হলো। প্রকৃতির এই **রূপান্তর** (Transformation) দেখেই কবি বিস্মিত।
৯. ‘ঝিকিরমিকির আলোর রূপালি এক ঝালর’ কীসের প্রতীক?
‘ঝিকিরমিকির আলোর রূপালি এক ঝালর’ হলো **সকালের শিশিরবিন্দু ও প্রথম আলোর** প্রতীক। রাতে জমে থাকা শিশিরবিন্দুর ওপর যখন প্রথম সূর্যের আলো পড়ে, তখন সেগুলো ঝিকঝিক করে ঝালরের মতো ঝলমল করে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘মায়াতরু’ শব্দটির অর্থ কী? গাছকে কেন ‘মায়াতরু’ বলা হয়েছে?
**’মায়াতরু’ শব্দের অর্থ:** মায়া (জাদু বা বিভ্রম) + তরু (গাছ) = **মায়াবী গাছ বা জাদুকরী গাছ**।
**মায়াতরু বলার কারণ:** এই গাছকে মায়াতরু বলা হয়েছে কারণ এটি **নির্দিষ্ট সময়ে তার রূপ ও প্রকৃতি পরিবর্তন করে**।
- **সন্ধ্যায় ভূত, রাতে ভালুক:** সন্ধ্যায় গাছটি **ভূতের** মতো দু’হাত তুলে নাচত, আবার চাঁদ উঠলে **ঘাড় ফুলানো ভালুকের** মতো গর্ গর্ করত।
- **বৃষ্টিতে রোগ, চাঁদে মুকুট:** বৃষ্টিতে তার **কম্প দিয়ে জ্বর** আসত। কিন্তু বৃষ্টির পরে চাঁদ উঠলে সেই গাছটিই **লক্ষ হীরার মাছের মুকুটে** সজ্জিত হতো।
- **সকালে ঝালর:** ভোরবেলা সেই মাছ উধাও হয়ে শুধু **রূপালি ঝালর** পড়ে থাকত।
আলো, অন্ধকার, ঋতু ও সময়ের প্রভাবে গাছের এই **অদ্ভুত, কাল্পনিক ও দ্রুত রূপান্তরের** কারণেই কবি একে ‘মায়াতরু’ বলেছেন।
২. মায়াতরু কবিতায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছের রূপের পরিবর্তনের তালিকা তৈরি করো।
আলো, অন্ধকার ও বৃষ্টির প্রভাবে মায়াতরুর রূপে যে পরিবর্তন আসে, তার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| সময়/অবস্থা | গাছের রূপ | কারণ |
|---|---|---|
| সন্ধ্যা | দু’হাত তুলে ভূতের নাচ | অন্ধকারে ডালপালা নড়লে |
| চাঁদ উঠলে | ঘাড় ফুলানো ভালুক | আবছা আলোয় গাছের চেহারার পরিবর্তন |
| বৃষ্টি এলে | কম্প দিয়ে জ্বর আসা | ঠান্ডা জলে পাতা কাঁপলে |
| বৃষ্টির শেষে চাঁদ উঠলে | লক্ষ হীরার মাছের মুকুট | চাঁদের আলোয় জলের বিন্দু ঝলমল করলে |
| ভোরবেলা/সকাল | রূপালি এক ঝালর | আলোয় শিশিরবিন্দু ঝলমল করলে |
৩. মায়াতরু কবিতায় কবি কীভাবে প্রকৃতির ওপর কল্পনার রং চড়িয়েছেন, আলোচনা করো।
অশোকবিজয় রাহা প্রকৃতির স্বাভাবিক ঘটনাগুলোকে মানবিক আবেগ ও অলৌকিকতা দিয়ে কল্পনা করেছেন:
- **মানবিকীকরণ:** গাছটির ডালকে তিনি **’দু’হাত’** বলেছেন, যা দিয়ে সে **’ভূতের নাচ’** নাচে। গাছের পাতা কাঁপা দেখে মনে হয়েছে তার **’কম্প দিয়ে জ্বর’** এসেছে।
- **জাদু ও অলৌকিকতা:** চাঁদের আলোয় ভেজা জলের বিন্দুকে তিনি **’লক্ষ হীরার মাছ’** বলে কল্পনা করেছেন, যা গাছটিকে **মুকুট** পরিয়ে দেয়। এটি প্রকৃতির একটি সাধারণ ঘটনাকে জাদুকরী দৃশ্যে রূপান্তরিত করেছে।
- **প্রাণীসত্তা আরোপ:** অন্ধকার ও আলোয় গাছটির আকৃতি পরিবর্তিত হয়, যা কখনো **’ভালুক’**-এর মতো গর্জন করে।
এইভাবে কবি গাছটির ওপর **কল্পনা, জাদু এবং মানবিক আবেগ** আরোপ করেছেন, যা সাধারণ গাছকে **’মায়াতরু’**-তে পরিণত করেছে।