বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
একাদশ পাঠ: লিমেরিক (এডোয়ার্ড লিয়ার/তরজমা: সত্যজিৎ রায়) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** হাস্যরস, অসঙ্গতি ও অদ্ভুত পরিস্থিতি।
—১. কবি পরিচিতি (Poet and Translator Information)
**এডোয়ার্ড লিয়ার (Edward Lear, ১৮১২-১৮৮৮):** তিনি একজন ইংরেজ কবি, সুরকার ও চিত্রশিল্পী। **লিমেরিক (Limerick)** নামে পরিচিত পাঁচ লাইনের এই হাস্যকর ছড়ার নতুন ধারার স্রষ্টা হিসেবে তিনি বিখ্যাত। তাঁর ছড়াগুলি সাধারণত অদ্ভুত বিষয়বস্তু, বাঁকা চোখে দেখা সমাজ এবং শেষে একটি অপ্রত্যাশিত পরিণতি নিয়ে তৈরি হয়।
**তরজমাকার:** বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাহিত্যিক **সত্যজিৎ রায়** এডোয়ার্ড লিয়ারের এই ছড়াগুলি অনুবাদ করেছেন। তাঁর অনুবাদগুলি **’তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’** নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
এই পাঠে তিনটি লিমেরিক সংকলিত হয়েছে, যা অদ্ভুত ও হাস্যকর পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে তৈরি।
- **প্রথম লিমেরিক (বুড়ো ও দাড়ি):** এক বুড়োর বিশাল দাড়ির মধ্যে বিভিন্ন পাখি—যেমন মোরগ, শালিকছানা, হুতোমপ্যাঁচা এবং হাঁড়িচাঁচা—আস্তানা বেঁধেছে। এটি বুড়োর অদ্ভুত সমস্যার কথা তুলে ধরে।
- **দ্বিতীয় লিমেরিক (খুদে বাবু ও মৌমাছি):** ফুল গাছে বসে থাকা এক খুদে বাবুকে মৌমাছি এসে মধু খেতে বাধা দেয় এবং সরে যেতে বলে। বাবুটি উত্তর দেয় যে, মৌমাছি আছে বলে কি লোক গাছে বসবে না?
- **তৃতীয় লিমেরিক (পাখিপ্রেমী):** এক পাখিপ্রেমী ব্যক্তি পাখি সম্বন্ধে সমস্ত বই মন দিয়ে পড়েন। কিন্তু তাঁর আফসোস, কারণ যে তল্লাটে তিনি থাকেন, সেখানে কোনো পাখিই নেই।
৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **মোরগ** | পুরুষ কুক্কুট, মোরগ পাখি | প্রথম লিমেরিকে মোরগ বুড়োর দাড়িতে বাসা বাঁধে। |
| **হুতোমপ্যাঁচা** | এক ধরণের নিশাচর পাখি (পেঁচা) | দাড়িতে **হুতোমপ্যাঁচা**ও আস্তানা বাঁধে। |
| **আস্তানা** | বাসস্থান, থাকার জায়গা | পাখিরা বুড়োর দাড়িতে **আস্তানা** গড়েছে। |
| **ঝক্কি** | ঝামেলা, সমস্যা | বাবুটি গাছে বসায় মৌমাছির **ঝক্কি** হয়েছে। |
| **চোপ রাও** | চুপ করে থাকো (ধমক দেওয়া) | বাবু মৌমাছিকে **চোপ রাও** বলে। |
| **আপশোশ** | আফসোস, দুঃখ, অনুতাপ | পাখি না থাকায় পাখিপ্রেমীর **আপশোশ**। |
| **তল্লাট** | এলাকা, অঞ্চল | পাখিপ্রেমীর **তল্লাটে** কোনো পাখি নেই। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. বুড়োর দাড়ির মধ্যে কোন কোন পাখি আস্তানা বেঁধেছিল?
বুড়োর দাড়ির মধ্যে **একটি মোরগ**, **চারটে শালিকছানা**, **দুই রকমের হুতোমপ্যাঁচা** এবং **একটা হাঁড়িচাঁচা** আস্তানা বেঁধেছিল।
২. খুদে বাবুকে দেখে মৌমাছির কেন সমস্যা হলো?
খুদে বাবুটি ফুল গাছে বসে ছিল। মৌমাছি সেই ফুল থেকে **মধু সংগ্রহ** করতে এসেছিল। বাবুটি গাছে বসে থাকায় মধু সংগ্রহ করতে মৌমাছির **’মহা ঝক্কি’** বা খুব সমস্যা হচ্ছিল।
৩. বাবুটি মৌমাছিকে কী বলে চুপ করিয়ে দিল?
খুদে বাবুটি মৌমাছিকে ধমক দিয়ে বলেছিল, **’চোপ রাও!’** এরপর সে যুক্তি দেয় যে, মৌমাছি গাছে আছে বলে কি অন্য লোক সেই গাছে বসতে পারবে না?
৪. তৃতীয় লিমেরিকের পাখিপ্রেমী ব্যক্তির দুঃখের কারণ কী?
তৃতীয় লিমেরিকের পাখিপ্রেমী ব্যক্তিটি **পাখি সম্বন্ধে সমস্ত বই** মন দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা পর্যন্ত পড়েন। কিন্তু তার দুঃখের কারণ হলো, যে **এলাকা বা তল্লাটে** তিনি থাকেন, সেখানে **একটিও পাখি নেই**।
৫. ‘বোঝো ব্যাপারখানা’—বুড়ো কেন এই কথাটি বলেছিল?
বুড়ো এই কথাটি বলেছিল কারণ তার **দাড়ির মধ্যে একাধিক ভিন্ন প্রজাতির পাখি** বাসা বেঁধে ফেলেছে। এই **অদ্ভুত, অপ্রত্যাশিত ও হাস্যকর পরিস্থিতি** বোঝাতেই সে বিস্মিত হয়ে কথাটি বলেছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘লিমেরিক’ কাকে বলে? এই ছড়াগুলির বৈশিষ্ট্য কী?
**লিমেরিক** হলো পাঁচ লাইনের একটি **হাস্যকর, অদ্ভুত ও কৌতুকপূর্ণ ছড়া**, যার নাম আয়ারল্যান্ডের লিমেরিক শহরের নাম থেকে এসেছে।
**বৈশিষ্ট্য:**
- **ছন্দ:** লিমেরিকের একটি নির্দিষ্ট ছন্দ (রাইম স্কিম) আছে। সাধারণত এর ছন্দ হয় **AABBA**। অর্থাৎ প্রথম, দ্বিতীয় ও পঞ্চম লাইনে এবং তৃতীয় ও চতুর্থ লাইনে মিল থাকে।
- **বিষয়বস্তু:** এর বিষয়বস্তু সাধারণত **অদ্ভুত, অসম্ভব বা অসঙ্গতিপূর্ণ** হয় (যেমন দাড়িতে পাখির বাসা)।
- **হাস্যরস:** এটি পাঠকদের মধ্যে **কৌতুক ও রস** সৃষ্টি করে।
- **দৈর্ঘ্য:** এটি অত্যন্ত **সংক্ষিপ্ত** পাঁচ লাইনের ছড়া।
২. দ্বিতীয় লিমেরিকটিতে যে কৌতুক ও যুক্তি রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করো।
দ্বিতীয় লিমেরিকটি একটি **হাস্যকর বিতর্ক** তুলে ধরেছে:
- **কৌতুক:** কৌতুকটি তৈরি হয়েছে যখন মৌমাছি তার মধু সংগ্রহের কাজে বাধা পেয়ে একটি ফুল গাছে বসে থাকা **মানুষকে সরে যেতে** বলছে। মানুষ (খুদে বাবু) যখন প্রকৃতির (মৌমাছি) স্বাভাবিক কাজে বাধা দেয়, তখন এই বিপরীত পরিস্থিতি কৌতুক সৃষ্টি করে।
- **যুক্তি:** বাবুটি মৌমাছিকে **’চোপ রাও’** বলে ধমক দেয় এবং পাল্টা যুক্তি দেখায়, **’তুমি আছো বলে গাছে বসবে না লোক কি?’** এই যুক্তিটি মানুষের দিক থেকে আপাতদৃষ্টিতে সঠিক, কিন্তু মৌমাছির দিক থেকে এটি তার খাদ্য সংগ্রহে বাধা। এই **যৌক্তিক বিতর্কের অসঙ্গতিই** লিমেরিকের মূল মজা।
৩. প্রথম ও তৃতীয় লিমেরিক দুটিতে কী ধরনের অদ্ভুত পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে?
লিমেরিক দুটিতে ভিন্ন ধরনের অদ্ভুত পরিস্থিতি রয়েছে:
- **প্রথম লিমেরিক (অতিরিক্ত আশ্রয়):** এখানে অদ্ভুত পরিস্থিতি হলো, একজন **মানুষের দাড়ি** (যা সাধারণত ছোটো ও ব্যক্তিগত অংশ) বিভিন্ন পাখির **আস্তানা** বা বাসা বাঁধার জায়গায় পরিণত হয়েছে। দাড়িটি যেন একটি চলমান **পক্ষী-নিবাস**। এই ঘটনা বুড়োর সমস্যার চরমতাকে তুলে ধরে।
- **তৃতীয় লিমেরিক (অসঙ্গতিপূর্ণ জ্ঞান):** এই লিমেরিকে অদ্ভুত অসঙ্গতি হলো, ব্যক্তিটি **পাখি সম্বন্ধে চূড়ান্ত জ্ঞানী** (সমস্ত বই পড়েছেন), কিন্তু যেখানে জ্ঞান প্রয়োগ করবেন, সেই **বাস্তব পাখি** তার তল্লাটে নেই। অর্থাৎ, তার **তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক জীবনের মধ্যে এক বিরাট শূন্যতা** রয়েছে, যা এক ধরনের সূক্ষ্ম হাস্যরস সৃষ্টি করে।