বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
অষ্টম পাঠ: ছেলেবেলা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** ছেলেবেলা (আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ) | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** বালক রবির নির্জনতা ও কল্পনাবিলাস।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১):** তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ জীবনে অজস্র সাহিত্য রচনা করেছেন, যার মধ্যে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা **’কথা ও কাহিনী’, ‘সহজপাঠ’, ‘শিশু’** ও **’শিশু ভোলানাথ’** অন্যতম। ১৯১৩ সালে **’গীতাঞ্জলি’** কাব্যের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি এশিয়ার মধ্যে প্রথম **নোবেল পুরস্কার** পান। ‘ছেলেবেলা’ হলো তাঁর লেখা একটি **আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ**।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘ছেলেবেলা’ গদ্যাংশে বালক রবীন্দ্রনাথের **একাকী জীবন** এবং **বাড়ির ছাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার** কথা বলা হয়েছে। লেখকের কাছে **ছাদটি ছিল ‘প্রধান ছুটির দেশ’** বা স্বাধীনতার জগৎ। যখন তাঁর বাবা (মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর) বাড়ি থাকতেন না, তখন ছাদ হয়ে উঠত তাঁর **’সাত সমুদ্দুর-পারে যাওয়ার আনন্দ’**।
তিনি লুকিয়ে দুপুরে ছাদে উঠতেন, কারণ দুপুরবেলাটা ছিল দিনের বেলাকার রাত্তিরের মতো **নিস্তব্ধ**। এই সময় বাড়ির চৌকিদাররা ঘুমাত। ছাদকে তিনি **’কেতাবে-পড়া মরুভূমি’** মনে করতেন, যেখানে **গরম বাতাস হু হু করে ছুটত**। এই মরুভূমিতে তাঁর কাছে জল পাওয়ার একমাত্র জায়গা ছিল **কলের জলের নাগাল-পাওয়া নাবার ঘর**, যা তাঁর কাছে ছিল **মরূদ্যান (ওয়েসিস)**।
ছুটি ফুরিয়ে এলে লেখকের মন খারাপ হতো। রবিবারের বিকেলটা তাঁর কাছে **’বিশ্রী রকমের মুখ বিগড়ে থাকা’** মনে হতো, কারণ পরের দিন সোমবার অর্থাৎ স্কুল শুরু। ছাদ থেকে তিনি পুকুরে **পাতিহাঁসের উঠে যাওয়া** এবং রাস্তার **জুড়িগাড়ির সইসের হাঁক** শুনতে পেতেন।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **চিলেকোঠা** | ছাদের উপরে সিঁড়ির ঘর বা ছোটো ঘর | পিতা এখানে বসে দূর থেকে দৃশ্য দেখতেন। |
| **পিল্পেগাড়ি** | হাতিতে টানা গাড়ি (বর্তমানে অপ্রচলিত) | ছাদে গেলে লোকবসতির **পিল্পেগাড়ি** পেরিয়ে যাওয়া যেত। |
| **বিবাগি** | সংসারত্যাগী, বৈরাগী | দুপুরবেলা বালক **সন্ন্যাসীর বিবাগি** হয়ে যাবার সময়। |
| **কেতাব** | কিতাব বা বই | ছাদটি লেখকের কাছে **কেতাবে-পড়া মরুভূমি** ছিল। |
| **ওয়েসিস** | মরূদ্যান (মরুভূমির মধ্যে যেখানে জল পাওয়া যায়) | নাবার ঘরটি ছিল ছাদের মরুভূমিতে একটি **ওয়েসিস**। |
| **দেউড়ি** | সদর দরজা বা প্রধান প্রবেশপথ | ছুটি শেষের দিকে দেউড়ির ঘণ্টায় চারটে বাজত। |
| **জুড়িগাড়ি** | দুই ঘোড়ায় টানা গাড়ি | রাস্তা থেকে **জুড়িগাড়ির সইসের** হাঁক শোনা যেত। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. বালক রবীন্দ্রনাথের প্রধান ছুটির দেশ কী ছিল?
বালক রবীন্দ্রনাথের প্রধান ছুটির দেশ ছিল বাড়ির **বাইরের খোলা ছাদ**।
২. দুপুর বেলাকে কেন ‘দিনের বেলাকার রাত্তির’ বলা হয়েছে?
দুপুরবেলা শহরের **কোলাহল ও লোকচলাচল** একেবারেই থেমে যেত, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ত। চারদিক তখন **নিস্তব্ধ** থাকত। এই নীরবতার কারণে দুপুর বেলাকে **’দিনের বেলাকার রাত্তির’** বলা হয়েছে।
৩. রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘ছাদ’ কেন ‘সাত সমুদ্দুর-পারে যাওয়ার আনন্দ’ এনে দিত?
বাড়ির অন্যান্য অংশে কঠোর নিয়ম ছিল। ছাদ ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এই ছাদ থেকে কলকাতার উঁচুনীচু ছাদ পেরিয়ে **আকাশের শেষ নীল** দেখা যেত। তাই ছাদটি তাঁর কল্পনাকে দূরে নিয়ে যেত এবং **স্বাধীনতার** স্বাদ দিত, যা সাত সমুদ্র পার হওয়ার আনন্দের মতোই ছিল।
৪. লেখক তাঁর পিতাকে ছাদে কেমনভাবে দেখতেন?
লেখক তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিলেকোঠার আড়ালে দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখতেন। সূর্য ওঠার আগে তিনি **সাদা পাথরের মূর্তির মতো** ছাদে চুপ করে বসে থাকতেন এবং **কোলে দুটি হাত জোড়-করা** থাকত।
৫. বালক রবীন্দ্রনাথ কেন লুকিয়ে ছাদে উঠতেন?
বাড়ি ভর্তি লোকজনের চোখ এড়িয়ে **নির্জনতার স্বাদ নিতে** বালক রবীন্দ্রনাথ ছাদে উঠতেন। দুপুরে চৌকিদাররা ঘুমিয়ে পড়লে তিনি খড়খড়ির ভিতর দিয়ে হাত গলিয়ে ছিটকিনি খুলে লুকিয়ে ছাদে উঠতেন।
৬. ‘ওয়েসিস’ এর প্রসঙ্গ কীভাবে রয়েছে?
লেখক ছাদকে **’কেতাবে-পড়া মরুভূমি’** মনে করতেন। এই মরুভূমিতে **লুকিয়ে-ঢোকা নাবার ঘরটি** ছিল তাঁর কাছে **’ওয়েসিস’ (মরূদ্যান)**। কল খুলে তিনি ধারাজল স্নান করতেন।
৭. ছুটির দিন শেষ হলে রবির মনের ভাব কেমন হতো?
ছুটির দিন শেষ হলে রবিবারের বিকেলটা তাঁর কাছে **’বিশ্রী রকমের মুখ বিগড়ে থাকা’** মনে হতো। কারণ **আসছে-সোমবারের হাঁ-করা মুখের গ্রহণ-লাগানো ছায়া** তাকে গ্রাস করতে শুরু করত (অর্থাৎ স্কুল খোলার চিন্তা মন খারাপ করত)।
৮. চুড়িওয়ালা কীভাবে বাড়ির বউকে চুড়ি পরাতো?
গলি দিয়ে চুড়িওয়ালার হাঁক পৌঁছালে বাড়ির বউ বালিশের উপর খোলা চুল এলিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকত। দাসী তাকে ডেকে আনলে বুড়ো চুড়িওয়ালা **কচি হাত টিপে টিপে পছন্দমতো বেলোয়ারি চুড়ি** পরিয়ে দিত।
৯. বালক রবীন্দ্রনাথের কাছে ছাদ কেন ‘কেতাবে-পড়া মরুভূমি’ ছিল?
ছাদ ছিল **খোলা, ধূ ধূ করা** এবং চারদিকে কোনো গাছপালা বা ঘরোয়া পরিবেশ ছিল না। দুপুরবেলা সেখানে **গরম বাতাস হু হু করে ছুটত ধুলো উড়িয়ে** এবং **আকাশের নীল রঙ ফিকে** হয়ে আসত। এই পরিবেশ বইতে পড়া মরুভূমির মতোই রুক্ষ ও শুষ্ক লাগতো।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘আমার জীবনে বাইরের খোলা ছাদ ছিল প্রধান ছুটির দেশ।’- লেখকের ছাদের প্রতি এই আসক্তি কেন ছিল?
খোলা ছাদকে ‘প্রধান ছুটির দেশ’ বলার পিছনে তিনটি প্রধান কারণ ছিল:
- **স্বাধীনতার স্বাদ:** রবীন্দ্রনাথের শৈশব কেটেছে কঠোর নিয়ম ও চৌকিদারদের পাহারায়। কিন্তু ছাদে গেলে তিনি সমস্ত **নিয়ম-কানুন ও লোকবসতির ঊর্ধ্বে** চলে যেতে পারতেন, যা তাঁকে **মুক্তির ও স্বাধীনতার** স্বাদ দিত।
- **কল্পনাবিলাস:** ছাদ থেকে তিনি **আকাশের শেষ নীল আর পৃথিবীর শেষ সবুজকে** মিশে যেতে দেখতেন। এই দৃশ্য তাঁকে কল্পনার জগতে, অর্থাৎ ‘সাত সমুদ্দুর-পারে’ যেতে সাহায্য করত।
- **নির্জনতা:** দুপুরে যখন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে যেত, তখন ছাদ হয়ে উঠত **নিস্তব্ধ** ও **একান্ত নিজস্ব**। এই নির্জনতা তাঁর **বালক সন্ন্যাসীর বিবাগি** মনে শান্তি দিত।
তাই, ছাদ কেবল একটি স্থান ছিল না, এটি ছিল তাঁর **কল্পনার মুক্তি ও মনের বিশ্রামের** জগৎ।
২. বালক রবীন্দ্রনাথের পিতার কলঘরের প্রতি আকর্ষণের কথা কী ভাবে জানা গেল?
লেখকের পিতার কলঘরটি ছিল **তেতালার ঘরে**। সেই সময়ে সাধারণত উপরের তলায় কলের জলের নাগাল পাওয়া যেত না। কিন্তু মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে তার ব্যবস্থা ছিল।
- **বিরল প্রাপ্তি:** এই কলঘরটি ছিল ছাদে থাকা **’মরুভূমি’তে এক ‘ওয়েসিস’ (মরূদ্যান)**-এর মতো।
- **সাহসিকতা:** লেখক লুকিয়ে খড়খড়ি খুলে ঘরে ঢুকে কল দিতেন খুলে এবং **ধারাজলে স্নান** করতেন। এই কাজ করতে গিয়ে তাঁকে যেন **’বাংলাদেশের শিশু লিভিংস্টন’** মনে হতো, যে নতুন কিছু আবিষ্কার করেছে।
- **সহজ মানুষ:** স্নানের পর বিছানার চাদর নিয়ে গা মুছে তিনি **সহজ মানুষ** হয়ে বসতেন।
এইভাবে একটি সাধারণ নাবার ঘর তাঁর কাছে **গুপ্তধনের ভান্ডার** ও **স্বাধীনভাবে জল ব্যবহারের** সুযোগ এনে দিত, যা তাঁর মনের আকর্ষণের পরিচয় দেয়।
৩. ছুটি শেষের দিকে এলে বালক রবীন্দ্রনাথের মনের করুণ ভাবটি কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
গদ্যাংশের শেষে ছুটি ফুরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বালক রবীন্দ্রনাথের মনে এক করুণ ও বিষাদের সুর বেজে ওঠে:
- **সময়ের ইঙ্গিত:** নীচের দেউড়ির **ঘণ্টায় যখন চারটে** বাজতো, তখন তিনি বুঝতে পারতেন যে রবিবারের বিকেল শেষ হতে চলল।
- **বিশ্রী বিকেল:** রবিবার বিকেলের আকাশ তাঁর কাছে **’বিশ্রী রকমের মুখ বিগড়ে থাকা’** মনে হতো।
- **সোমবারের ভয়:** আসছে-সোমবার অর্থাৎ স্কুল খোলার চিন্তা তাঁর কাছে **’হাঁ-করা মুখের গ্রহণ-লাগানো ছায়া’**-এর মতো মনে হতো, যা যেন সেই আনন্দময় বিকেলটাকে গ্রাস করে নিতে আসত।
- **মন খারাপের দৃশ্য:** মন-খারাপ নিয়ে ছাদ থেকে নিচের দিকে তাকালে তাঁর চোখে পড়ত পুকুর থেকে **পাতিহাঁসগুলোর উঠে যাওয়া**, যা যেন দিনের আলো ঘোলা হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের প্রতীককে বিদায় জানাচ্ছে।
এইভাবে প্রকৃতির রঙ ও সময়ের ধ্বনির মাধ্যমে তাঁর **স্কুলে যাওয়ার ভয় ও ছুটি ফুরোনোর দুঃখ** ফুটে উঠেছে।
৪. ‘সেদিনকার দুপুর বেলাকার সেই চুপচাপ বেলা আজ আর নেই’— লেখক কোন সময়ের কথা বলেছেন? এই সময়ের সঙ্গে এখনকার দুপুরের পার্থক্য কী?
**উল্লিখিত সময়:** লেখক তাঁর **ছেলেবেলার, ঠাকুরবাড়ির** সেই সময়ের কথা বলেছেন, যখন দুপুরে সবাই ঘুমিয়ে পড়ত এবং শহর ছিল অত্যন্ত শান্ত ও নির্জন।
**পার্থক্য:**
- **শব্দ ও গতি:** সেই সময় দুপুরবেলা ছিল **’চুপচাপ বেলা’**, যেখানে কেবল চুড়িওয়ালার হাঁক বা চিলের ডাক শোনা যেত। কিন্তু **আজকের দিনে** শহর অনেক বেশি ব্যস্ত, যানবাহন ও কোলাহলে ভরা।
- **মানুষের মন:** আগেকার দুপুরে মানুষজন বিশ্রাম নিত, কিন্তু এখনকার দিনে কাজের চাপ ও অস্থিরতার কারণে সেই **গভীর শান্তি** আর পাওয়া যায় না।
- **পরিবর্তন:** লেখক একটি রূপকের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, আগেকার বাড়ির বউ এখনকার দিনে ‘সেকেন্ড ক্লাসে পড়া মুখস্থ করছে’ এবং চুড়িওয়ালা এখন রিকশা ঠেলছে—এই পরিবর্তনই সেই **চুপচাপ বেলাকে** পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
৫. বালক রবীন্দ্রনাথের জীবনে তাঁর পিতার ভূমিকা সংক্ষেপে লেখো।
গদ্যাংশে রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি কম হলেও, তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ:
- **আদর্শ ও নির্জনতা:** পিতা যখন বাড়িতে থাকতেন, তখন তিনি **সাদা পাথরের মূর্তির মতো** শান্ত ও স্থির হয়ে ছাদে বসে **উপাসনা** করতেন। এটি বালক রবির মনে এক **গম্ভীর ও আধ্যাত্মিক** প্রভাব ফেলেছিল।
- **স্বাধীনতার কারণ:** পিতা যখন **পাহাড়-পর্বতে** অনেক দিনের জন্য চলে যেতেন, তখনই বালক রবির ছাদ হয়ে উঠত ‘প্রধান ছুটির দেশ’ বা **স্বাধীনতার সর্বোচ্চ ক্ষেত্র**।
- **আকর্ষণ:** পিতার অনুপস্থিতিই বালক রবিকে তাঁর **কলঘরের প্রতি আকর্ষণ** বাড়াতে সাহায্য করেছিল, যা তাঁর ছেলেবেলার অ্যাডভেঞ্চারের অন্যতম অংশ ছিল।
সুতরাং, পিতা তাঁর উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি—উভয় দিক দিয়েই বালক রবীন্দ্রনাথের **স্বতন্ত্রতা ও কল্পনা বিকাশে** গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।