বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
নবম পাঠ: মাঠ মানে ছুট (কার্তিক ঘোষ) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত কবিতা | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** শৈশবে মাঠ ও দৌড়ানোর দার্শনিক তাৎপর্য এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
—১. কবি পরিচিতি (Author Information)
**কার্তিক ঘোষ (জন্ম ১৯৫০):** তিনি হুগলি জেলার আরামবাগে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিখ্যাত **কবি ও ছড়াকার**। ইস্কুল জীবন থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলি হলো—**’একটা মেয়ে একা’, ‘হাত ঝুমঝুম পা ঝুমঝুম’, ‘আমার বন্ধু গাছ’** এবং **’দলমা পাহাড়ের দুলকি’**। তিনি ‘সংসদ’ পুরস্কার, শিশু সাহিত্য জাতীয় পুরস্কার সহ বহু সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘মাঠ মানে ছুট’ কবিতাটিতে কবি **কার্তিক ঘোষ** শৈশবের দুটি বিষয়—**’মাঠ’** এবং **’ছুট’**-এর গভীর তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে ‘মাঠ’ কেবল খেলা বা ছুটি কাটানোর জায়গা নয়, এটি **অগাধ খুশির লুটোপুটি, হল্লা, হাসি** এবং **ঘুম তাড়ানো বাঁশির** মতো আনন্দের উৎস। মাঠ হলো **’সবুজ প্রাণের শাশ্বত এক দীপ’** (চিরন্তন আলো) এবং **এগিয়ে যাওয়ার** স্পন্দন।
তেমনি, **’ছুট’** মানে কেবল দৌড়ানো নয়। ছুট হলো **আশা, সাহস, বাঁচা** এবং **শক্ত পায়ের পোক্ত ভাষা**। ছুট হলো **’ছোট্ট পাখির আগল ভাঙা খাঁচা’**-র মতো মুক্তি। ছুটন্ত প্রাণেই জীবনকে অনুভব করা যায়। কবি বলেছেন, ছুট জীবন এবং সোনার মতো মূল্যবান। তাই ছুট কী, তা বুঝতে হলে একবার **ছুটে দেখতে** হবে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **অথই** | যার তল নেই, গভীর | মাঠ মানে **অথই** খুশির লুটোপুটি। |
| **লুটোপুটি** | গড়াগড়ি, খেলাধুলার সময় গড়াগড়ি খাওয়া | শিশুদের আনন্দে **লুটোপুটি** খাওয়ার স্থান মাঠ। |
| **হল্লা** | চিৎকার-চেঁচামেচি, কোলাহল | মাঠ মানে কেবল **হল্লা** নয়। |
| **নিকেল করা** | ধাতুর প্রলেপ দেওয়া, এখানে উজ্জ্বল ও ঝকঝকে | **নিকেল করা** বিকেলের আলো মাঠে পড়ে। |
| **শাশ্বত** | চিরন্তন, চিরকালীন | মাঠ হলো সবুজ প্রাণের **শাশ্বত** এক দীপ। |
| **পোক্ত** | মজবুত, পাকা | ছুট মানে **শক্ত পায়ের পোক্ত** কোনো ভাষা। |
| **আগল** | দরজার খিল, বাঁধন | ছুট হলো **আগল ভাঙা** খাঁচার মতো। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. মাঠ বলতে কবি কী কী বোঝাতে চেয়েছেন? (যে কোনো দুটি)
মাঠ বলতে কবি বোঝাতে চেয়েছেন: ১. **অথই খুশির অগাধ লুটোপুটি**। ২. **ঘুম তাড়ানো মন হারানো বাঁশি**। ৩. **সবুজ প্রাণের শাশ্বত এক দীপ**।
২. ‘মাঠ মানে ছুট এগিয়ে যাবার—পিপির পিপির পিপ।’— এই পঙ্ক্তিটির অর্থ ব্যাখ্যা করো।
কবি এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মাঠ কেবল খেলাধুলার জায়গা নয়, এটি **জীবনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার** প্রতীক। **’পিপির পিপির পিপ’** শব্দটি হলো সেই **উৎসাহ ও সংকেত**, যা দৌড়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
৩. কবি ‘ছুট’ বলতে কী কী বোঝাতে চেয়েছেন? (যে কোনো দুটি)
কবি ‘ছুট’ বলতে বোঝাতে চেয়েছেন: ১. **আশা, সাহস ও বাঁচা**। ২. **শক্ত পায়ের পোক্ত কোনো ভাষা**। ৩. **ছোট্ট পাখির আগল ভাঙা খাঁচা**।
৪. ‘ছুট মানে কী ছোট্ট পাখির আগল ভাঙা খাঁচা!’— এই উপমাটির সার্থকতা কোথায়?
পাখি খাঁচায় বন্দি থাকলে সে স্বাধীন হতে পারে না। খাঁচার **’আগল’ (খিল/বাঁধন)** ভেঙে পাখি যেমন **মুক্তি ও স্বাধীনতা** পায়, তেমনই ছুটও মানুষের মনে **সমস্ত বাঁধন ভেঙে বেরিয়ে আসার** আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতা জাগায়। তাই উপমাটি সার্থক।
৫. ‘মাঠ মানে তো সবুজ প্রাণের শাশ্বত এক দীপ’— কেন মাঠকে ‘দীপ’ বলা হয়েছে?
**’দীপ’** বা প্রদীপ হলো **আলো, আশা ও জীবনের প্রতীক**। মাঠ সবুজ প্রাণ ও অফুরন্ত শক্তির উৎস। এই মাঠে ছুটলে বা খেললে শৈশবের প্রাণশক্তি সজীব থাকে। তাই মাঠকে **চিরন্তন (শাশ্বত)** প্রাণের আলো (দীপ) বলা হয়েছে।
৬. ‘নিকেল করা বিকেল’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
**নিকেল** একটি উজ্জ্বল ধাতু। সূর্যের পড়ন্ত আলো যখন মাঠের উপর পড়ে, তখন মাঠটি ঝকঝকে ও মসৃণ দেখায়। সেই **উজ্জ্বল, ঝলমলে, সুন্দর বিকেলকে** কবি **’নিকেল করা বিকেল’** বলে কল্পনা করেছেন।
৭. ছুট কী করে ‘সাতটি সবুজ সমুদ্দুরের ঢেউকে ডেকে আনে’?
ছুটন্ত মন বা **’ছুটন্ত সব প্রাণে’** থাকে সীমাহীন **আশা ও স্বপ্ন**। সাত সমুদ্রের ঢেউ যেমন অসীমতার প্রতীক, তেমনই ছুটও মনের মধ্যে **অগাধ আনন্দ, উদ্দীপনা ও স্বপ্নের ঢেউ** জাগিয়ে তোলে।
৮. ‘ছুট মানে কী ছুটেই দেখো—আর কিছু বলব না।।’— কেন কবি এমন কথা বলেছেন?
কবি জানেন যে **’ছুট’**-এর আসল অর্থ **তাত্ত্বিকভাবে বোঝানো অসম্ভব**। এটি হলো এক **অনুভূতির বিষয়**। তাই এর গভীরতা, আনন্দ ও মুক্তি অনুভব করার জন্য একবার দৌড়ে দেখতে হবে। অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই এর সার্থকতা বোঝা সম্ভব।
৯. ‘নাচনা পায়ের বাজনা তাধিন ধিন’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মাঠে খেলার আনন্দে যখন পা দুটি চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং শিশুরা ছোটাছুটি করে, তখন পায়ের এই দ্রুত সঞ্চালন বা **নাচনে** এক ধরণের **শব্দ ও ছন্দ** তৈরি হয়। সেই ছন্দকেই কবি **’তাধিন ধিন’** বা বাজনার আওয়াজের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘মাঠ মানে ছুট’ কবিতায় ‘মাঠ’-এর বিভিন্ন তাৎপর্যগুলি বিশ্লেষণ করো।
‘মাঠ’ এই কবিতায় কেবল খেলার জায়গা নয়, এটি শৈশবের এক বিশাল প্রতীক, যার তাৎপর্য বহুমুখী:
- **আনন্দের আধার:** মাঠ হলো **মজা, ছুটি, হল্লা ও হাসি**-র উৎস। এটি **অথই খুশির অগাধ লুটোপুটি**-র জায়গা।
- **মুক্তির ক্ষেত্র:** মাঠ সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি দেয়। এখানে শিশু তার **ঘুম তাড়ানো বাঁশি** শুনতে পায়।
- **জীবনের আলো:** মাঠ হলো **’সবুজ প্রাণের শাশ্বত এক দীপ’**। অর্থাৎ, মাঠ যেন শিশুদের মধ্যে এক **চিরন্তন প্রাণের আলো** জ্বালিয়ে রাখে।
- **অগ্রগতির সংকেত:** মাঠ হলো **’ছুট এগিয়ে যাবার’** সংকেত। এটি শারীরিক ও মানসিকভাবে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।
সুতরাং, মাঠ হলো শৈশবের **স্বাধীনতা, শক্তি ও অকৃত্রিম আনন্দের** প্রতিচ্ছবি।
২. ‘ছুট’ কীভাবে ‘আশা’, ‘সাহস’ এবং ‘বাঁচা’-র প্রতীক হয়ে ওঠে, বুঝিয়ে লেখো।
কবি কার্তিক ঘোষের কাছে ‘ছুট’ কেবল শারীরিক গতি নয়, এটি এক দার্শনিক প্রতীক:
- **আশা:** ছুট হলো **এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা**। মানুষ যখন জীবনের লক্ষ্য পূরণের জন্য ছোটে, তখন তার মনে **নতুন আশা** জাগে। ছুট যেন এক **শক্ত পায়ের পোক্ত ভাষা**, যা আশার কথা বলে।
- **সাহস:** ছুটতে গেলে **পড়ে যাওয়ার ভয়** কাটিয়ে উঠতে হয়। জীবনের পথে এগিয়ে যেতেও সাহসের প্রয়োজন। ছুট তাই **ভয়কে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস** যোগায়।
- **বাঁচা:** ছুট হলো **জীবনশক্তির** প্রতীক। থেমে থাকা বা অলসতা হলো জড়তা, কিন্তু ছুট হলো **’জীবন এবং সোনা’**। এটি **অকৃত্রিমভাবে বেঁচে থাকার** এবং **মুক্তি (আগল ভাঙা খাঁচা)** পাওয়ার স্পন্দন।
৩. ‘মাঠ মানে ছুট’ কবিতাটিতে শৈশবের কোন কোন দিক ফুটে উঠেছে?
‘মাঠ মানে ছুট’ কবিতাটিতে শৈশবের নিম্নলিখিত দিকগুলি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে:
- **নিঃশর্ত আনন্দ:** শৈশব হলো **মজা, হল্লা, হাসি ও লুটোপুটির** সময়। মাঠে গেলেই এই নিঃশর্ত আনন্দ ফিরে আসে।
- **স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা:** শিশুমন স্বভাবতই **মুক্তিকামী**। তাই ছুটকে **’আগল ভাঙা খাঁচা’**-র সঙ্গে তুলনা করে কবি শৈশবের বাঁধনমুক্তির ইচ্ছাকে তুলে ধরেছেন।
- **অলসতাহীনতা:** শৈশবের প্রাণশক্তিতে কোনো **আলস্য** নেই। তাই ছুট সবসময় **’ছুটন্ত সব প্রাণে’** এবং **’এগিয়ে যাবার’** কথা বলে।
- **অসীম কল্পনা:** শৈশবের কল্পনা অসীম। মাঠের ছুট যেন মনের মধ্যে **’সাতটি সবুজ সমুদ্দুরের ঢেউ’** ডেকে আনে, যা কল্পনার বিস্তৃতিকে বোঝায়।
৪. ‘মাঠ’ ও ‘ছুট’ একে অপরের পরিপূরক— কবিতা অবলম্বনে যুক্তি দাও।
মাঠ ও ছুট একে অপরের পরিপূরক, কারণ তারা একে অপরের **অস্তিত্ব ও সার্থকতাকে** পূর্ণ করে:
- **মাঠের সার্থকতা ‘ছুটে’:** মাঠকে যদি **’শাশ্বত এক দীপ’** বলা হয়, তবে সেই দীপ জ্বলে ওঠে **’ছুট’**-এর আলোয়। মাঠ যদি বিশাল না হতো, তবে সেখানে **’অগাধ লুটোপুটি’** বা **’তাধিন ধিন’** নাচনা সম্ভব হতো না।
- **ছুটের ভিত্তি ‘মাঠে’:** ছুট হলো **মুক্তি, সাহস ও জীবন**। এই মুক্তি ও সাহস প্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র হলো **খোলা মাঠ**। চার দেওয়ালের মধ্যে ছুট তার আসল অর্থ হারায়।
- **একই লক্ষ্য:** উভয়ের লক্ষ্যই হলো **শৈশবের প্রাণশক্তিকে সজীব রাখা**। মাঠ হলো **আশ্রয়** আর ছুট হলো সেই আশ্রয়ে তৈরি হওয়া **স্পন্দন**।
তাই, মাঠ হলো **আধার** এবং ছুট হলো সেই আধারে থাকা **শক্তি ও গতি**—যা একে অপরের অনুপস্থিতিতে মূল্যহীন।
৫. ‘মাঠ মানে ছুট’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
কবিতাটির নামকরণ **’মাঠ মানে ছুট’** অত্যন্ত সার্থক হয়েছে:
- **কেন্দ্রীয় ভাবনা:** কবিতার মূল বিষয় হলো **মাঠ (স্থান)** এবং **ছুট (গতি/ভাবনা)**-এর সম্পর্ক। নামকরণটি সরাসরি কবিতার এই **কেন্দ্রীয় ভাবধারাকে** প্রকাশ করেছে।
- **তাৎপর্য প্রকাশ:** কবি এই নামের মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন যে, **মাঠের আসল অর্থই হলো ছুট**। মাঠ কেবল খেলার মাঠ নয়, এটি **এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ, স্বাধীনতা ও আশা** (যা ছুট দ্বারা প্রতীকায়িত) দেয়।
- **সংক্ষিপ্ততা ও আকর্ষণ:** নামটি সংক্ষিপ্ত, শ্রুতিমধুর এবং সহজেই মনে রাখার মতো। এটি পাঠকের মনে **তাৎক্ষণিক কৌতূহল** সৃষ্টি করে যে, মাঠের সঙ্গে দৌড়ানোর কী গভীর সম্পর্ক থাকতে পারে।
যেহেতু কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতেই মাঠ ও ছুটের গভীর অর্থ ও তাদের অভিন্নতাকে বোঝানো হয়েছে, তাই এই নামকরণটি **ভাববস্তু ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক**।