বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
পঞ্চদশ পাঠ: ফণীমনসা ও বনের পরি (বীরু চট্টোপাধ্যায়) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** শিশুসাথী পত্রিকা | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** নিজের প্রতি সন্তুষ্টি, প্রকৃতির দানকে স্বীকার করা এবং অতিরিক্ত লোভের পরিণতি।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**বীরু চট্টোপাধ্যায় (১৯১৭-১৯৮৪):** তিনি শিশু ও কিশোর পাঠকদের উপযোগী **রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনির** লেখক হিসাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন। তোমাদের পাঠ্য **’ফণীমনসা ও বনের পরি’** নাটিকাটি তাঁর লেখা, যা **’শিশুসাথী’** পত্রিকা (৪৩তম সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৭১) থেকে নেওয়া হয়েছে।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘ফণীমনসা ও বনের পরি’ একটি শিক্ষামূলক রূপকথার নাটিকা। **ফণীমনসা গাছটি** তার কাঁটাভরা, ছুঁচোলো পাতার জন্য খুব **অসন্তুষ্ট** ছিল এবং **বনের পরি**-র কাছে তার পাতা বদলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়।
**চারটি পাতা পরিবর্তনের পর্ব:**
- **১ম পরিবর্তন (সোনার পাতা):** ফণীমনসা সোনার পাতা চাইলে পরি তা মঞ্জুর করে। কিন্তু **একদল ডাকাত** এসে সেই পাতা ছিঁড়ে নিয়ে যায়।
- **২য় পরিবর্তন (কাচের পাতা):** এরপর ফণীমনসা **কাচের পাতা** চায়। মৃদুমন্দ বাতাসে কাচের পাতা টুং-টাং শব্দ করলেও, **দুর্দান্ত ঝড়** এসে সেই পাতা গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেয়।
- **৩য় পরিবর্তন (কচি সবুজ পাতা):** এরপর সে **পালং শাকের মতো কচি নরম সবুজ পাতা** চায়। কিন্তু একটি **ক্ষুধার্ত ছাগল** এসে সেই পাতা কচকচ করে খেয়ে ফেলে।
- **৪র্থ পরিবর্তন (নিজস্ব পাতা):** অবশেষে ফণীমনসা অনুতপ্ত হয়ে বনের পরি-র কাছে **তার নিজের কাঁটাভরা ছুঁচোলো পাতা** ফিরিয়ে দেওয়ার আবদার জানায়। পরি তাকে সুবুদ্ধি হয়েছে জেনে সেই পাতা ফিরিয়ে দেয়।
নাটিকাটির শেষে বনের পরি ফণীমনসাকে শিক্ষা দেয় যে, **নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট না থাকলে** এমন দুর্দশাই হয়। ফণীমনসা গাছও প্রতিজ্ঞা করে, আর কখনো সে **মিছে বায়নাক্কা** করবে না।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **ফণীমনসা** | কাঁটাযুক্ত পাতা ও কাণ্ড বিশিষ্ট একপ্রকার মরু উদ্ভিদ (Cactus) | গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র **ফণীমনসা** গাছ। |
| **আপশোশ** | দুঃখ, আক্ষেপ | ফণীমনসা তার পাতার জন্য **আপশোশ** করত। |
| **বিতিকিচ্ছিরি** | কুৎসিত, বিশ্রী, জঘন্য | ফণীমনসা তার পাতাকে **বিতিকিচ্ছিরি** বলত। |
| **তথাস্তু** | ‘তাই হোক’ (পরির বরদান বা আদেশ) | ফণীমনসার আবদারে পরি **তথাস্তু** বলে। |
| **দর্প-ভরে** | গর্ব ভরে, অহংকার নিয়ে | ঝড় **দর্প-ভরে** ধেয়ে এসেছিল। |
| **মুড়িয়ে** | ছেঁটে বা খেয়ে ফেলা | ছাগল পাতাগুলি **মুড়িয়ে** খেল। |
| **স্বচক্ষে** | নিজের চোখে | বনপরি সব ঘটনা **স্বচক্ষে** দেখেছিল। |
| **বায়নাক্কা** | আবদার, জেদ | শিক্ষা পাওয়ার পর ফণীমনসা আর **মিছে বায়নাক্কা** করেনি। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. ছোট্ট ফণীমনসা গাছের মনে শান্তি ছিল না কেন?
ফণীমনসা গাছটি তার **কাঁটাভরা, ছুঁচোলো** পাতার জন্য খুব অসন্তুষ্ট ছিল। আশেপাশে গাছেদের সুন্দর সুন্দর পাতা দেখে তার রাগে ও দুঃখে মন রি-রি করত, তাই তার মনে শান্তি ছিল না।
২. ফণীমনসা বারে বারে পাতাগুলো পালটে দেওয়ার আবেদন কার কাছে করছিল?
ফণীমনসা বারে বারে পাতাগুলো পালটে দেওয়ার আবেদন **বনের পরি**-র কাছে করছিল।
৩. প্রথমবার পাতা বদলের পর ফণীমনসার কী হয়েছিল?
প্রথমবার ফণীমনসা **সোনার পাতা** পেয়েছিল। সে আনন্দে ডগমগ হয়ে ওঠে। কিন্তু **একদল ডাকাত** এসে সেই সোনার পাতা ছিঁড়ে নিয়ে তাকে একেবারে **ন্যাড়া** করে রেখে যায়।
৪. কাচের পাতা পাওয়ার পর গাছটির সৌন্দর্য কেমন ছিল?
কাচের পাতা পাওয়ার পর ফণীমনসা গাছের সারা অঙ্গ **ঝলমলিয়ে** ওঠে। সূর্যের কিরণ লেগে সেই পাতার উপর **রামধনু রং ঝিকিমিকি** খেতে থাকে। মৃদুমন্দ বাতাসে **মধুর টুং-টাং শব্দ** হতো।
৫. ঝড় এলে ফণীমনসা গাছের কাচের পাতার কী অবস্থা হলো?
**দুর্দান্ত ঝড়** আকাশ দিয়ে ধেয়ে এসেছিল। সেই ভয়ানক ঝড়ে ধাক্কা খেয়ে ফণীমনসা গাছের **সমস্ত কাচের পাতা গুঁড়ো গুঁড়ো** হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল।
৬. ছাগল কেন ফণীমনসা গাছের নরম পাতা খেতে এসেছিল?
ফণীমনসা তৃতীয়বার পাতা বদল করে **পালং শাকের মতো কচি নরম সবুজ পাতা** চেয়েছিল। ছাগল তার স্বভাব অনুযায়ী যা পায় তাই চিবিয়ে খায়। নরম পাতা দেখে তার **জিবে জল ঝরতে** থাকে এবং সে সেই পাতা খেতে এসেছিল।
৭. ঝড় তার নিজের পরিচয় কীভাবে দিয়েছিল?
ঝড় তার নিজের পরিচয় দিয়েছিল যে, তারা হলো **’পবনের দুষ্টু ছেলে’**। তারা **দর্প-ভরে** হু-হু-শোঁ-শোঁ শব্দ করে চলে এবং ওলটপালট করা ও গাছপালা ভেঙে দেওয়াই তাদের **পণ** (প্রতিজ্ঞা)।
৮. বনের পরি ফণীমনসাকে কী শিক্ষা দিল?
বনের পরি ফণীমনসাকে শিক্ষা দিল যে, **নিজের অবস্থায় ও নিজের চেহারা নিয়ে যে সন্তুষ্ট না থাকে**, তার ফণীমনসার মতোই দুর্দশা হয়। প্রকৃতির দানকে **স্বীকার করে নিতে** হয়।
৯. ফণীমনসা কেন শেষ পর্যন্ত নিজের কাঁটাভরা পাতাই ফিরিয়ে চাইল?
ফণীমনসা প্রথমে সোনার পাতা, তারপর কাচের পাতা এবং শেষে নরম পাতা পেয়েছিল। কিন্তু লোভের কারণে প্রতিবারই সে সেই পাতা হারায় এবং **হাড়-জিরজিরে ন্যাড়া চেহারা** নিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত হয়। তাই সে বুঝতে পারে, তার **নিজের কাঁটাভরা পাতাগুলিই শতগুণে ভালো**, কারণ সেগুলি তাকে রক্ষা করতে পারে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট না থাকলে তার তোমার মতোই দুর্দশা হয়’— বনের পরি কখন এই কথাটি বলেছিল? এই নাটিকার মাধ্যমে লেখক কী বার্তা দিতে চেয়েছেন?
**উক্তিটির প্রেক্ষাপট:** ফণীমনসা গাছটি যখন তৃতীয়বার তার নরম পাতা ছাগলের পেটে যাওয়ার পর অনুতপ্ত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে, তখন বনের পরি তাকে দেখে এই কথাটি বলেছিল।
**লেখকের বার্তা:** এই নাটিকার মাধ্যমে লেখক পাঠককে যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে চেয়েছেন তা হলো:
- **সন্তুষ্টির শিক্ষা:** নিজের যা আছে, তাতেই **সন্তুষ্ট থাকা** উচিত। ফণীমনসা তার কাঁটাভরা পাতা দিয়ে সুরক্ষিত ছিল, কিন্তু লোভের বশে সেই সুরক্ষা হারায়।
- **লোভের পরিণতি:** অতিরিক্ত **লোভ** (সোনার পাতা) এবং **অহংকার** (নরম পাতা) সবসময় খারাপ পরিণতি ডেকে আনে। ডাকাত, ঝড় ও ছাগলের আক্রমণ লোভের প্রতীক।
- **প্রকৃতির সুরক্ষা:** প্রকৃতির দানস্বরূপ কাঁটাভরা পাতা ছিল ফণীমনসার **প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা**। প্রকৃতির সেই ব্যবস্থাকে তুচ্ছ করলে বিপদ অনিবার্য।
২. বনের পরি-কে ফণীমনসার পাতা বদলের প্রতিটি আবদারে সাড়া দিতে হয়েছিল কেন? এই আবদারগুলি কীভাবে এক একটি বিপদের জন্ম দিয়েছিল, লেখো।
ফণীমনসা বারবার অনুরোধ করায় বনের পরি তাকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। পরি জানত, ফণীমনসা তার **লোভ ও অসন্তুষ্টির** কারণে বিপদে পড়বে এবং তবেই সে সুশিক্ষা পাবে।
**আবদার ও বিপদ:**
| আবদার | বিপদের কারণ | বিপদ |
|---|---|---|
| সোনার পাতা | মূল্যবান জিনিসের প্রতি লোভ | **ডাকাত** এসে ছিঁড়ে নিয়ে যায়। |
| কাচের পাতা | অস্থিরতা ও ভঙ্গুর সৌন্দর্য | **দুর্দান্ত ঝড়** এসে গুঁড়ো করে দেয়। |
| নরম সবুজ পাতা | অতিরিক্ত কোমলতা ও অসহায়তা | একটি **ক্ষুধার্ত ছাগল** এসে খেয়ে ফেলে। |
৩. ‘সোনার পাতা’, ‘কাচের পাতা’ ও ‘নরম সবুজ পাতা’— এই তিনটি পাতা ফণীমনসাকে কেন রক্ষা করতে পারেনি?
এই তিনটি পাতা ফণীমনসাকে রক্ষা করতে পারেনি, কারণ এগুলি ছিল **কৃত্রিম এবং প্রকৃতির নিয়মের বাইরে**:
- **সোনার পাতা (লোভের প্রতীক):** সোনা মূল্যবান হওয়ায় তা **ডাকাতদের** লোভের কারণ হয়েছিল। যে জিনিস যত মূল্যবান, তার বিপদ তত বেশি।
- **কাচের পাতা (ভঙ্গুরতার প্রতীক):** কাচ দেখতে সুন্দর হলেও তা **ভঙ্গুর**। **ঝড়ের** মতো প্রবল প্রাকৃতিক শক্তির মোকাবিলা করার ক্ষমতা কাচের ছিল না।
- **নরম সবুজ পাতা (অসহায়তার প্রতীক):** কচি ও নরম পাতা ছিল **অসহায়** এবং পশুর খাদ্য। **ছাগলের** মতো সাধারণ প্রাণী থেকেও নিজেকে বাঁচানোর ক্ষমতা এই পাতার ছিল না।
শুধুমাত্র তার **নিজের কাঁটাভরা রসভরা মোটা পাতাগুলিই** ছিল প্রকৃতির দেওয়া তার **আসল প্রতিরক্ষা**। অন্য পাতাগুলি তার **অতিরিক্ত লোভ ও অসন্তুষ্টির** ফল, যা তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।