বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
দ্বাদশ পাঠ: ঝড় (মৈত্রেয়ী দেবী) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত কবিতা | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** শিশুর চোখে ঝড়ের ভয় ও মুগ্ধতা, কল্পনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা।
—১. কবি পরিচিতি (Author Information)
**মৈত্রেয়ী দেবী (১৯১৪-১৯৯০):** তিনি ছিলেন একজন খ্যাতনামা লেখিকা, রবীন্দ্রজীবনের কথাকার এবং সমাজসেবিকা। তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম **’উদিতা’**। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—**’মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’, ‘স্বর্গের কাছাকাছি’** এবং তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস **’ন হন্যতে’**। ১৯৭৭ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক **’পদ্মশ্রী’** উপাধি পান।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘ঝড়’ কবিতাটিতে একটি শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে **হঠাৎ আসা এক কালবৈশাখী ঝড়ের** বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শিশুটি হাটবারের দিন দুপুরবেলা মাঠের ধারে খেলা করছিল, এমন সময় কোথা থেকে **এলোমেলো বাতাস** এসে চারদিক **অন্ধকারে** ঢেকে দিল। সঙ্গীরা ভয়ে ‘ঝড় এসেছে’ বলে ছুটে পালাতে চাইলেও শিশুটির মনে সেই ঝড়ের আগমন **’ভারী ভালো’** লাগে।
ঝড়ের প্রভাবে **আকাশ, বকুলতলা, চাঁপার বন**—সবকিছু **এক্কেবারে কালো** হয়ে যায়। নদীর মাঝি তাড়াতাড়ি পাড়ি দেয়। ঝড়ের এমন রূপ দেখে শিশুটির মনে হয়, যেন **কারো ছেলে কালির দোয়াত হঠাৎ ফেলে দিয়েছে**। আকাশ তখন **ভীষণ কেমন আগুন জ্বেলে** হেসে ওঠে (বিদ্যুতের ঝলকানি)। এরপর ঝড়টি আবার যেন ঘুরে ঘুরে **সাত সাগরের পারে** পালিয়ে যায়।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **হাটবার** | সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বসা বাজার বা হাটের দিন | শিশুটির ঝড়ের অভিজ্ঞতা হয়েছিল **হাটবারের** দিন। |
| **এলোমেলো** | অগোছালো, বিশৃঙ্খল | কোথা থেকে **এলোমেলো বাতাস** এল। |
| **দোয়াত** | লেখার কালি রাখার পাত্র | ঝড় যেন **কালির দোয়াত** ফেলে দিয়েছে। |
| **পাড়ি** | নদী বা সাগর পার হওয়া | কালো জলে মাঝি তাড়াতাড়ি **পাড়ি** দিল। |
| **কমল** | নরম, কোমল | ঝড়ের পর আকাশ **কোমল ঠোঁট** মেলে হাসল। |
| **এক্কেবারে** | একেবারে, সম্পূর্ণরূপে | আকাশখানা **এক্কেবারে কালো** হলো। |
| **সাগর** | সমুদ্র | ঝড় যেন **সাত সাগরের পারে** পালিয়ে গেল। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. শিশুটি কখন এবং কোথায় খেলা করছিল?
শিশুটির ঝড়ের অভিজ্ঞতা হয়েছিল **হাটবারের দিন দুপুরবেলা**। সে **মাঠের ধারে** খেলা করছিল।
২. ঝড়ের আগমনে প্রকৃতির কেমন পরিবর্তন দেখা গেল?
হঠাৎ **এলোমেলো বাতাস** এল এবং চারদিক **অন্ধকারে** ঢেকে গেল। আকাশ, **বকুলতলা, চাঁপার বন**—সবকিছু **এক্কেবারে কালো** হয়ে গেল।
৩. ঝড়ের ভয়ে অন্যদের কী মনোভাব ছিল এবং শিশুটির কেমন লেগেছিল?
ঝড়ের ভয়ে শিশুটির সঙ্গীরা **’ঝড় এসেছে’** বলে **ছুটে পালাতে** চেয়েছিল। কিন্তু শিশুটির মনে সেই ঝড়ের আগমন **’ভারী ভালো’** লেগেছিল।
৪. ঝড়ের সময় মাঝির কাজ কেমন ছিল?
ঝড়ের সময় নদীর জল কালো হয়ে গিয়েছিল। মাঝি বিপদ বুঝে দ্রুত **তাড়াতাড়ি** নৌকা নিয়ে **পাড়ি** দিয়েছিল।
৫. শিশুটির মনে ঝড় সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি হলো?
ঝড় সম্পর্কে শিশুটির মনে ধারণা হলো—যেন **কারো ছেলে কালির দোয়াত হঠাৎ ফেলে দিয়েছে**। সেই কালি মেঝের ওপর ঢালার মতোই চারদিক কালো হয়ে গেল।
৬. ঝড় আসার সময় ‘ভীষণ কেমন আগুন জ্বেলে’— এর দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
‘ভীষণ কেমন আগুন জ্বেলে’ কথাটির দ্বারা ঝড়ের সময় **বিদ্যুতের ঝলকানিকে** বোঝানো হয়েছে। যখন আকাশ হঠাৎ হেসে ওঠে, তখনই এই তীব্র আলোর ঝলক দেখা যায়।
৭. ঝড় কোথায় পালালো বলে শিশুটি মনে করেছে?
ঝড়ের তাণ্ডব শেষ হওয়ার পর শিশুটির মনে হলো, ঝড়টি যেন **ঘুরে ঘুরে** অনেক দূরে **সাত সাগরের পারে** পালিয়ে গেল।
৮. ‘অন্ধকারে সমস্ত দিক কেনে দিল ঢেকে’— এখানে ‘কেনে দিল’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এখানে ‘কেনে দিল’ (ছেড়ে দিল বা ভরে দিল) বলতে বোঝানো হয়েছে যে, হঠাৎ বাতাস আসার কারণে **কালো মেঘের ঘনঘটা** তৈরি হলো, যার ফলে চারপাশ এতটাই অন্ধকার হয়ে গেল যে মনে হচ্ছিল যেন কালো অন্ধকার এসে **সমগ্র দিককে** গ্রাস করে বা ঢেকে দিয়েছে।
৯. ঝড়ের শেষে আকাশ কেমনভাবে হাসল?
ঝড়ের শেষে আকাশ **’কোমল ঠোঁটটি মেলে’** হাসল। এটি ঝড়ের পর **শান্তি ফিরে আসার** এবং পরিবেশের স্বাভাবিকতা ফিরে পাওয়ার প্রতীক।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘ঝড় কারে মা কয়?’— শিশুর কল্পনায় ঝড়ের আগমন ও বিদায়ের চিত্রটি আলোচনা করো।
**আবির্ভাব (আগমন):** শিশুটি যখন মাঠের ধারে খেলা করছিল, তখন হঠাৎ **এলোমেলো বাতাস** এসে চারদিক **অন্ধকারে ঢেকে** দেয়। শিশুটি কল্পনা করে যে ঝড় হলো **কারো ছেলে**, যে দুষ্টুমি করে **কালির দোয়াত** ফেলে দিয়েছে, তাই চারদিক কালো হয়ে গেল। এই সময় বিদ্যুতের ঝলকানিতে মনে হলো যেন **আকাশ ভীষণ আগুন জ্বেলে** হাসছে।
**তিরোভাব (বিদায়):** ঝড়ের তাণ্ডব শেষে যখন প্রকৃতি শান্ত হলো, শিশুটির মনে হলো ঝড়টি যেন **’কোমল ঠোঁটটি মেলে’** হাসল এবং ঘুরে ঘুরে অনেক দূরে **সাত সাগরের পারে** পালিয়ে গেল। এই কল্পনার মাধ্যমে শিশুটি ঝড়ের **ভয়ঙ্কর রূপ** এবং তার পরবর্তী **শান্তি**—এই দুটি দিককেই প্রকাশ করেছে।
২. ঝড়ের আগমনে প্রাকৃতিক পরিবেশে যে পরিবর্তন আসে, তা কবিতা অবলম্বনে লেখো।
ঝড়ের আগমনে প্রাকৃতিক পরিবেশে আসে এক নাটকীয় পরিবর্তন:
- **বাতাস ও অন্ধকার:** হঠাৎ **এলোমেলো বাতাস** আসে এবং মুহূর্তের মধ্যে **সমস্ত দিক অন্ধকারে** ঢেকে যায়।
- **রঙের পরিবর্তন:** **আকাশ** এবং মাটির সমস্ত জায়গা, যেমন **বকুলতলা ও চাঁপার বন**, সব **এক্কেবারে কালো** হয়ে যায়।
- **জলাশয়ের পরিবর্তন:** নদীর জল কালো হয়ে ওঠে এবং সেই **কালো জলে মাঝি** দ্রুত নৌকা নিয়ে পাড়ি দেয়।
- **আলো ও শব্দ:** আকাশে ঘন ঘন **বিদ্যুতের ঝলকানি** দেখা যায়, যা যেন ‘ভীষণ কেমন আগুন জ্বেলে’ হাসছে।
এই পরিবর্তনগুলি ভয় ও মুগ্ধতা—উভয় অনুভূতিই জাগায় এবং ঝড়ের **প্রবল শক্তিকে** ফুটিয়ে তোলে।
৩. ঝড়ের ভয় ও মুগ্ধতা— এই দুটি বিপরীত অনুভূতি কীভাবে শিশুটির মনে প্রকাশিত হয়েছে?
ঝড়ের দুটি বিপরীত দিক শিশুটির মনে একযোগে কাজ করেছে:
- **ভয় (অন্যদের চোখে):** শিশুটির সঙ্গীরা ঝড়কে **বিপদ** মনে করে **ছুটে পালাতে** চেয়েছিল। ঝড় হলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রতীক, যা মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করে।
- **মুগ্ধতা (শিশুর চোখে):** যদিও চারদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, শিশুটির মনে কিন্তু তা **’ভারী ভালো’** লেগেছিল। ঝড়ের ভয়ঙ্কর রূপকে সে **কালির দোয়াত ফেলে দেওয়া দুষ্টু ছেলের** খেলার সঙ্গে তুলনা করে। বিদ্যুতের ঝলকানিকেও সে **আগুনের হাসি** হিসেবে দেখেছে।
শিশুটির এই **কল্পনাশক্তি** তাকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা **রহস্য ও সৌন্দর্যকে** উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়, যা তার মনে মুগ্ধতা তৈরি করে এবং ভয়কে ভুলিয়ে দেয়।