বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
দশম পাঠ: পাহাড়িয়া বর্ষার সুরে (লোককথা ও প্রবন্ধ) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত লোকসাহিত্য | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক পরিবেশ, আদিবাসী সংস্কৃতি ও লোককথা।
—১. পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট (Context and Background)
এই পাঠটি উত্তরবঙ্গের **হিমালয়ের পাদদেশ, তরাই অঞ্চলের সবুজ বন ও পাহাড়ি নদীকে** কেন্দ্র করে রচিত। এটি দুটি ভাগে বিভক্ত: প্রথম অংশে রয়েছে **উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের (মেচ, রাভা, গারো, লেপচা, টোটো) জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি** নিয়ে একটি প্রবন্ধের অংশ; এবং দ্বিতীয় অংশে রয়েছে বৃষ্টি আনার জন্য **ব্যাঙের অভিযান** নিয়ে একটি **লেপচা লোককথা**।
**কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** প্রকৃতি ও মানুষ এখানে এক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতিতে নদী, জঙ্গল এবং বর্ষার প্রভাব অনস্বীকার্য।
—২. গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সংস্কৃতি (Key Information)
- **অঞ্চল:** পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশের **তরাই** অঞ্চল।
- **নদী:** তিস্তা, তোর্সা, রঙ্গিত—এই পাহাড়ি নদীগুলো বনের গা দিয়ে বয়ে চলেছে।
- **আদি জনগোষ্ঠী:** মেচ, রাভা, গারো, লেপচা, টোটো। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষা আছে।
- **রাভা গান:** রাভা গোষ্ঠীর জীবন উৎসবে মুখর হয় গানের সুরে। দল বেঁধে **মাছ ধরতে যাওয়া** তাদের এক আনন্দময় পর্ব। গানের মূল ভাব হলো: নতুন জলের আগমন এবং এক দিকে মাছ না পেলে অন্য দিকে যাওয়ার আহ্বান। (মূল গান: ‘ফৈ লীগী ফৈ না রীতিয়া…’)
- **লেপচা লোককথা:** লেপচাদের কথার ভাঁড়ারে বৃষ্টি আসে কেমন করে, তা নিয়ে গল্প রয়েছে।
৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **পাদদেশ** | পাহাড়ের নিচের অংশ বা গোড়া | হিমালয়ের **পাদদেশে** তরাই অঞ্চল। |
| **তরাই** | হিমালয়ের পাদদেশের সমতল ভূমি | তরাই অঞ্চলে সবুজ বন রয়েছে। |
| **খরা** | অনাবৃষ্টি, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়া | পৃথিবীতে **খরা** হওয়ায় ব্যাঙ ভগবানের কাছে গিয়েছিল। |
| **উৎসবে** | আনন্দ-অনুষ্ঠান, পার্বণ | ভগবানের প্রাসাদে সবাই **উৎসবে** ব্যস্ত ছিল। |
| **গাফিলতি** | উদাসীনতা, অবহেলা | ভগবান মন্ত্রীদের **গাফিলতির** জন্য তিরস্কার করেন। |
| **উল্লসিত** | খুব খুশি, আনন্দিত | বৃষ্টি আনার জয়ে ব্যাঙ **উল্লসিত** হয়ে ফিরে গেল। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. উত্তরবঙ্গের পাহাড়িয়া অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ কেমন?
উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে রয়েছে হিমালয়ের পাদদেশের **সবুজ তরাই বন**। এই বনের গা দিয়ে **তিস্তা, তোর্সা ও রঙ্গিত**-এর মতো পাহাড়ি নদী বয়ে চলেছে। এই অঞ্চলটি প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক সুন্দর ক্ষেত্র।
২. উত্তরবঙ্গের তরাই অঞ্চলে কোন কোন আদি জনগোষ্ঠীর বাস?
উত্তরবঙ্গের তরাই অঞ্চলের বন ও নদীর বাঁকে **মেচ, রাভা, গারো, লেপচা এবং টোটো**—এই আদি জনগোষ্ঠীর বাস। এঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে।
৩. রাভা গোষ্ঠীর আনন্দময় পর্ব কোনটি এবং তাদের গানের মূলভাব কী?
রাভা গোষ্ঠীর জীবনে **দল বেঁধে মাছ ধরতে যাওয়া** হলো এক আনন্দময় পর্ব। তাদের গানের মূলভাব হলো: **নতুন বছরের নতুন জলে নদীর কূল ছাপিয়ে যাওয়ায় আনন্দ** এবং এক দিকে মাছ না পেলে অন্য দিকে মাছ ধরার জন্য **এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান**।
৪. লেপচা লোককথা অনুসারে কেন পৃথিবীতে খরা হয়েছিল?
লেপচা লোককথা অনুসারে পৃথিবীতে খুব খরা হয়েছিল, কারণ **স্বর্গের ভগবান তার রাজত্বের আনন্দ-উৎসব ও ভোজে ব্যস্ত** ছিলেন এবং পৃথিবী রাজ্যের দিকে **মন দেননি (গাফিলতি)**।
৫. বৃষ্টি আনার অভিযানে ব্যাঙের সঙ্গী কারা হয়েছিল?
বৃষ্টি আনার অভিযানে ব্যাঙের সঙ্গী হয়েছিল— ১. **মৌমাছি** (ফুলের অভাবে মধু পাচ্ছিল না), ২. **মোরগ** (ফসল নষ্ট হওয়ায় দানা পাচ্ছিল না) এবং ৩. **বাঘ** (জীবজন্তু না খেয়ে মারা গেলে সেও বাঁচতে পারবে না বলে)।
৬. ব্যাঙ ভগবানের কাছে কেন গিয়েছিল?
পৃথিবীতে দীর্ঘ অনাবৃষ্টি বা **খরা** হওয়ায় মানুষ, পশু, গাছপালা সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। ব্যাঙ স্বেচ্ছায় **বৃষ্টি আনার** কাজে যুক্ত হয় এবং ভগবান কেন তাঁর সৃষ্টিকে অবহেলা করছেন, তা জিজ্ঞাসা করতে তাঁর প্রাসাদে যায়।
৭. ভগবান ও তাঁর রক্ষীরা কীভাবে নাকাল হলো?
ভগবান যখন রক্ষীদের ডাকেন, তখন **মৌমাছিরা** রক্ষীদের মুখে **হুল ফোটাতে** থাকে। **বাঘ** তাদের খেয়ে নেবে বলে ভয় দেখায় এবং **মোরগ** ডানা ঝাপটে গোলমাল বাড়ায়। ফলে ভগবান ও তাঁর রক্ষীরা অসহায় (নাকাল) হয়ে পড়ে।
৮. রাভা গানে কোন কোন পাখির উল্লেখ রয়েছে? তাদের অবস্থা কেমন ছিল?
রাভা গানে **কুরুয়া পাখি, বক এবং মাছরাঙা** পাখির উল্লেখ রয়েছে। কুরুয়া পাখি **উড়ে উড়ে কাঁদছিল**। বকেরা **সার বেঁধে উড়ছিল**। আর মাছরাঙা বারবার ছোঁ মেরেও **মাছ ধরতে পারেনি**।
৯. ভগবানের প্রাসাদের দৃশ্য দেখে ব্যাঙ কেন রাগে উত্তেজিত হয়ে উঠল?
পৃথিবী যখন খরার কারণে ধ্বংস হচ্ছে, তখন ভগবানের প্রাসাদে সবাই **নানান ভোজ ও আনন্দ-উৎসবে** ব্যস্ত ছিল। পৃথিবীর এই চরম অভাব ও কষ্টের প্রতি ভগবানের এই **উদাসীনতা (গাফিলতি)** দেখে ব্যাঙ রাগে উত্তেজিত হয়ে উঠল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. লেপচা লোককথা অবলম্বনে বৃষ্টি আনার ব্যাঙের অভিযানের গল্পটি নিজের ভাষায় লেখো।
একবার পৃথিবীতে খরার কারণে যখন মানুষ, পশু ও গাছপালা ধ্বংসের মুখে, তখন **ব্যাঙ** স্বেচ্ছায় বৃষ্টি আনার দায়িত্ব নেয়। সে ভগবানের কাছে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রা শুরু করে।
পথে তার সঙ্গী হয় **মৌমাছি** (মধু না পাওয়ায়), **মোরগ** (দানা না পাওয়ায়) এবং **বাঘ** (জীবজন্তুরা মারা গেলে সে একা বাঁচতে পারবে না বলে)। ভগবানের প্রাসাদে পৌঁছে তারা দেখে, সবাই আনন্দ-উৎসবে ব্যস্ত এবং পৃথিবীর প্রতি উদাসীন। রাগে উত্তেজিত হয়ে তারা ভগবানের কাছে গেলে রক্ষীরা তাদের আটকানোর চেষ্টা করে। তখন মৌমাছি হুল ফোটায়, বাঘ ভয় দেখায় এবং মোরগ ডানা ঝাপটে গোলমাল করে। শেষে ভগবান তাঁর **মন্ত্রীদের গাফিলতির জন্য তিরস্কার** করেন। এই জয়ের আনন্দে উল্লসিত ব্যাঙ সরবে পুকুরে ফিরে যায়। সেই থেকে যখনই **ব্যাঙ ডাকে, তখনই বৃষ্টি নামে**।
২. উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলের প্রকৃতি ও আদিবাসীদের জীবনের মধ্যেকার সম্পর্ক কেমন?
উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে আদিবাসীদের জীবন **প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধনে** বাঁধা।
- **প্রকৃতির কোলে বাস:** তরাই-এর সবুজ বন, তিস্তা, তোর্সা, রঙ্গিত নদীর আঁকে-বাঁকে মেচ, রাভা, লেপচা, টোটোদের বাস। প্রকৃতিই তাদের **আশ্রয়** দিয়েছে।
- **নদী ও জীবন:** পাহাড়ি নদী তাদের জীবনের **চলাচলের পথ** ও **খাদ্যের উৎস**। বর্ষার নতুন জলে মাছ ধরতে যাওয়া রাভা গোষ্ঠীর আনন্দময় পর্ব।
- **সংস্কৃতি ও প্রকৃতি:** তাদের গান ও গল্পে প্রকৃতিই মূল বিষয়। লেপচাদের বৃষ্টি আনার লোককথা বা রাভাদের মাছ ধরার গান—এ সবই প্রমাণ করে, তাদের **সংস্কৃতি ও ভাষা** প্রকৃতির দান।
এদের জীবন, উৎসব ও অর্থনীতি সবই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তাই এই অঞ্চলে প্রকৃতি ও মানুষ একে অপরের **পরিপূরক**।
৩. লেপচা লোককথার ঘটনাটি মানুষের কোন গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সমস্যাকে প্রতীকী রূপে তুলে ধরেছে?
লেপচা লোককথার ঘটনাটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সমস্যাকে প্রতীকী রূপে তুলে ধরেছে:
- **ক্ষমতার কেন্দ্রে উদাসীনতা:** গল্পে ভগবান পৃথিবীর কষ্টের প্রতি উদাসীন ছিলেন, কারণ তিনি নিজের প্রাসাদে উৎসবে মগ্ন ছিলেন। এটি প্রতীকী অর্থে বোঝায় যে, **ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষেরা** (শাসক বা ধনী) কীভাবে **সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট** (খরা) নিয়ে উদাসীন থাকেন।
- **ঐক্যের শক্তি:** ব্যাঙ, মৌমাছি, মোরগ ও বাঘ—যারা প্রকৃতিতে একে অপরের থেকে আলাদা ও দুর্বল, তারাও **ঐক্যবদ্ধ হয়ে** যখন তাদের দাবি নিয়ে ভগবানের সামনে দাঁড়ায়, তখন তাদের জয় হয়। এটি প্রমাণ করে যে, ছোটো হলেও **একতাবদ্ধ শক্তির** কাছে ক্ষমতাও হার মানতে বাধ্য হয়।
সুতরাং, এই গল্পটি **সামাজিক বৈষম্য ও গণ-প্রতিবাদের শক্তিকে** তুলে ধরে।