বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
পঞ্চম পাঠ: পাখির কাছে, ফুলের কাছে (আল মাহমুদ) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** পাখির কাছে ফুলের কাছে কাব্যগ্রন্থ | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** প্রকৃতি ও কল্পনার জগতে কবির বিচরণ।
—১. কবি পরিচিতি (Poet Information)
**আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯):** তিনি বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত কবি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে। তিনি ভাষা-বিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ কাগজের সম্পাদক ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো—**’লোক-লোকান্তর’, ‘কলের কলম’** এবং **’সোনালি কাবিন’**। তিনি বাংলা আকাদেমি পুরস্কার-সহ বহু সম্মানে সম্মানিত। আলোচ্য কবিতাটি তাঁর **’পাখির কাছে ফুলের কাছে’** কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
কবিতাটিতে কবি **আল মাহমুদ** এক গভীর রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করেছেন। নারকোল গাছের লম্বা মাথায় চাঁদকে **ডাবের মতো ঠান্ডা ও গোলগাল** দেখতে পেয়ে কবি আস্তে করে ছিটকিনি খুলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। **ঝিমধরা মস্ত শহরটা** তখন থরথর করে কাঁপছিল।
শহরের মিনার, লাল পাথরের গির্জে, দরগাতলা পেরিয়ে তিনি যখন বাঁক নেন, তখন এক **উটকো পাহাড়** তাকে ‘আয় আয়’ বলে ডাকে। লালদিঘির পাড়ে **জোনাকিদের দরবার** বসেছিল। দিঘির জল তাকে **’না ঘুমানোর দলে’** যোগ দিতে আহ্বান জানায় এবং রক্তজবার ঝোপের কাছে পকেট থেকে ছড়ার বই খুলে **কাব্য** লেখার আবদার করে। কবি তখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে পাখি ও ফুলের কাছে মন খুলে মনের কথা বলেন।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **ডাব** | অপরিপক্ব নারকেলের জলভরা শাঁস | চাঁদকে **ডাবের** সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। |
| **ছিটকিনি** | দরজা-জানলা বন্ধ করার খিল বা হুড়কো | কবি **ছিটকিনি** খুলে ঘর থেকে বেরোন। |
| **ঝিমধরা** | অবসন্ন, নিস্তব্ধ | তখন **ঝিমধরা** মস্ত শহর কাঁপছিল। |
| **মিনার** | মসজিদ বা সৌধের উঁচু স্তম্ভ | কবি **মিনারকে** দাঁড়িয়ে থাকা কারো মতো দেখেন। |
| **উটকো** | অপরিচিত, অনাহূত | **উটকো** পাহাড় কবিকে ডেকেছিল। |
| **দরবার** | সভা বা অধিবেশন | লালদিঘির পাড়ে **জোনাকিদের দরবার** বসেছিল। |
| **কলরব** | পাখি বা বহু লোকের সমবেত আওয়াজ | কাব্য লেখার আবদারে ফুল-পাখিরা **কলরব** জুড়ল। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. চাঁদকে কিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে? কবি সেটি কোথায় দেখেছিলেন?
কবি চাঁদকে **ডাবের মতো ঠান্ডা ও গোলগাল** বলে তুলনা করেছেন। তিনি নারকোল গাছের **লম্বা মাথায়** হঠাৎ সেটি দেখতে পেয়েছিলেন।
২. ‘ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিল থরথর’— কেন শহরকে ঝিমধরা বলা হয়েছে?
কবিতাটি গভীর রাতে লেখা। গভীর রাতে শহরের সমস্ত **মানুষজন ও কোলাহল** থেমে যায়। তাই শহরটিকে **নিস্তব্ধ ও অবসন্ন** বা ‘ঝিমধরা’ বলা হয়েছে।
৩. কবি মিনার এবং গির্জাকে কেমন রূপে দেখেছিলেন?
কবি **মিনারকে** দেখেছিলেন যেন **কেউ দাঁড়িয়ে আছেন**। আর **পাথরঘাটার গির্জেটাকে** দেখেছিলেন যেন সেটি **লাল পাথরের ঢেউ**।
৪. লালদিঘির পাড়ে কিসের দরবার বসেছিল? সেই দরবারে কারা ছিল?
লালদিঘির পাড়ে **জোনাকিদের দরবার** বসেছিল। এই দরবারের সদস্যরা ছিল দিঘির **কালো জল, ফুল ও পাখিরা**।
৫. ‘উটকো পাহাড়’ কবির কাছে কী আবদার জানিয়েছিল? এই ডাকের তাৎপর্য কী?
কবি মোড় ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে **উটকো পাহাড়** তাকে **’আয় আয়’** বলে ডেকেছিল। এই ডাকের মাধ্যমে প্রকৃতি যেন কবিকে **স্বাভাবিকভাবে তার নিস্তব্ধ জগতে স্বাগত** জানাচ্ছিল।
৬. ‘আমরা সবাই না ঘুমানোর দল’— কারা এই দলের সদস্য?
কবি যখন দিঘির পাড়ে পৌঁছান, তখন দিঘির কালো জল জানায় যে, **তারা সবাই ‘না ঘুমানোর দল’**। এই দলের সদস্যরা ছিল **দিঘির জল, জোনাকিরা, ফুল ও পাখিরা**।
৭. দিঘির জল কবির কাছে কী আবদার করেছিল?
দিঘির কালো জল কলকলিয়ে কবিকে তার **পকেট থেকে পদ্য লেখার ভাঁজ (ছড়ার বই)** খুলতে বলেছিল, কারণ সেই রাতে **রক্তজবার ঝোপের কাছে কাব্য** হবে।
৮. কবিকে কোথায় কাব্য লিখতে বলা হয়েছিল এবং কেন?
কবিকে **রক্তজবার ঝোপের কাছে** কাব্য লিখতে বলা হয়েছিল। কারণ ফুল, পাখি, ও দিঘির জল চেয়েছিল, প্রকৃতির মাঝে সেই রাতে যেন **এক আনন্দের আসর** তৈরি হয়।
৯. ‘কাব্য হবে, কাব্য কবে—জুড়ল কলরব।’— কারা কেন কলরব জুড়ল?
দিঘির জলের কথা শুনে **ফুল ও পাখিরা** কলরব জুড়ল। কাব্য হবে শুনে তারা **আনন্দে ও উত্তেজনায়** একসঙ্গে আওয়াজ করতে শুরু করেছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘পাখির কাছে, ফুলের কাছে’ কবিতায় গ্রাম ও শহরের যে মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে, তা আলোচনা করো।
কবিতাটিতে শহরের পটভূমিতে প্রকৃতির বিচিত্র দিক উঠে এসেছে:
- **শহরের উপাদান:** কবি ঘর থেকে বেরিয়েই দেখেন **ঝিমধরা মস্ত শহর**, যেখানে **মিনার** (যা মসজিদের প্রতীক) এবং **পাথরঘাটার গির্জে** (খ্রিস্টান উপাসনাগৃহ) রয়েছে। এছাড়া **দরগাতলা** এবং কবির ঘর-বাড়িও শহরের অংশ।
- **প্রকৃতির উপাদান:** এর বিপরীতে রয়েছে **নারকোল গাছ**, **চাঁদ**, **উটকো পাহাড়**, **লালদিঘি**, **জোনাকিদের দরবার**, **রক্তজবার ঝোপ** এবং **ফুল-পাখি**।
কবি শহরের কোলাহল ও নির্জনতা ভেদ করে প্রকৃতির উপাদানগুলোর মধ্যে **সজীবতা ও প্রাণের খোঁজ** পেয়েছেন, যা এই কবিতাকে এক **মিশ্র চিত্রকল্প** দান করেছে।
২. ‘আয় আয়’ বলে উটকো পাহাড় কবিকে কেন ডাকল? এই ডাকের মাধ্যমে কবি কীসের প্রতি আকর্ষণ দেখিয়েছেন?
**উটকো পাহাড়ের ডাক:** কবি যখন দরগাতলা পার হয়ে বাঁ দিকে মোড় নিলেন, তখনই এক **অপরিচিত (উটকো) পাহাড়** তাকে **’আয় আয়’** বলে ডেকেছিল। এটি কবির কাছে কোনো বাস্তব ঘটনা ছিল না, বরং গভীর রাতে তাঁর **কল্পনার প্রতিফলন**।
**আকর্ষণ:** এই ডাকের মাধ্যমে কবি **প্রকৃতির রহস্যময় ও বন্ধুত্বপূর্ণ আকর্ষণকে** তুলে ধরেছেন। কবি যেন শহরের বস্তুজগত ছেড়ে প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নিতে চাইছিলেন। তাই পাহাড়টিও কবির কল্পনাপ্রবণ মনকে তার **শান্ত ও অলৌকিক জগতে** স্বাগত জানাচ্ছিল। এই ডাক **প্রকৃতির নিস্তব্ধতার মধ্যে এক প্রাণের স্পন্দন** সৃষ্টি করে, যা কবিকে কাব্য রচনায় উদ্দীপিত করে।
৩. ‘না ঘুমানোর দল’ বলতে কবি কাদের বুঝিয়েছেন? তাদের কাজ কী ছিল?
**’না ঘুমানোর দল’** বলতে কবি সেই সমস্ত **প্রাকৃতিক উপাদানকে** বুঝিয়েছেন যারা গভীর রাতেও জেগে থেকে পৃথিবীর সৌন্দর্য ও জীবনের স্পন্দন বজায় রাখে।
**দলের সদস্য ও কাজ:**
- **দিঘির কালো জল:** এটি কবিকে আহ্বান করে এবং তাদের দলের নেতা হয়ে কাব্য রচনার আবদার জানায়।
- **জোনাকি:** তারা আলো জ্বালিয়ে দরবার বসিয়েছিল, যা রাতের আঁধারেও জীবনের উৎস ধরে রাখে।
- **ফুল ও পাখিরা:** তারাও দিঘির কথায় সাড়া দিয়ে কলরব শুরু করে, যা তাদের **আনন্দের বহিঃপ্রকাশ**।
এই দলের প্রধান কাজ ছিল **কবির সঙ্গে কাব্য রচনা করা**। অর্থাৎ, প্রকৃতির এই উপাদানগুলি কবির **অনুপ্রেরণা** হিসেবে কাজ করে, যা নিস্তব্ধ রাতেও সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠে।
৪. চাঁদ ওঠা থেকে শুরু করে কাব্য রচনা পর্যন্ত কবি প্রকৃতির যে সজীবতা অনুভব করেছেন, তা বিশ্লেষণ করো।
কবি এই কবিতায় প্রকৃতিকে এক **জীবন্ত সত্তা** হিসেবে অনুভব করেছেন।
- **সজীব চাঁদ:** চাঁদকে দেখে মনে হয়েছে সেটি যেন **ডাবের মতো গোলগাল ও ঠান্ডা**, যা নারকোল গাছের লম্বা মাথায় উঠেছে।
- **জীবন্ত কাঠাম:** শহরের **মিনার** যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে, **গির্জেটা** যেন লাল পাথরের ঢেউ এবং **পাহাড়টি** যেন কবির সঙ্গে কথা বলছে—’আয় আয়’ বলে ডাকছে।
- **কথাবার্তা ও আসর:** **লালদিঘির কালো জল** কলকল করে কবির সঙ্গে কথা বলেছে, **জোনাকিরা** যেন সভা (দরবার) বসিয়েছে। **ফুল ও পাখিরা**ও তাদের কথায় সায় দিয়ে কলরব শুরু করে।
এভাবে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন কবির চোখে কথা বলার ক্ষমতা এবং মানবিক আবেগ পেয়েছে, যা কবির **কল্পনা ও প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক সংযোগকে** তুলে ধরে।
৫. কবি আল মাহমুদ কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে তার মনের কথা বলেন? কবিতা অবলম্বনে লেখো।
কবি আল মাহমুদ প্রকৃতির আহ্বানকে **সৃষ্টির আহ্বান** হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাদের সাথে তার মনের কথা বলেন এভাবে:
- **প্রকৃতির আহ্বান গ্রহণ:** দিঘির জল, ফুল ও পাখিরা যখন কাব্য লেখার আবদার জানায়, কবি তখন তাদের সেই ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেন।
- **কাব্য রচনা:** তিনি আর দেরি না করে পকেট থেকে **ছড়ার বই (পদ্য লেখার ভাঁজ)** খুলে নেন।
- **মনের কথা প্রকাশ:** তিনি সেই **পাখি ও ফুলের কাছে** মন খুলে তার **মনের কথা কই** (বলেন)। অর্থাৎ, তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য ও সজীবতার মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করে দেন এবং সেই পরিবেশ থেকেই **কবিতা বা ছড়া** রচনা করেন।
এইভাবে কবি নিজের **কল্পনা ও কবিতার ভাষা** ব্যবহার করে প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় কথোপকথনে লিপ্ত হন।