বাংলা সাহিত্য (তৃতীয় শ্রেণি)
দ্বিতীয় পাঠ: দেওয়ালের ছবি (প্রচলিত গল্প) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** প্রচলিত লোককথা | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য, ক্ষমতাবানদের জয়গান এবং বাস্তবের ভুল ব্যাখ্যা।
—১. গল্পের পটভূমি ও চরিত্র (Setting and Characters)
**পটভূমি:** অনেক অনেক দিন আগের কথা, যখন আমাদের দেশে **ঘন বন** ছিল। গল্পটি সেই **বনের ধারে এক গাঁয়ের শিকারি** এবং **এক বাঘের বন্ধুত্বকে** কেন্দ্র করে রচিত।
**চরিত্র:**
- **শিকারি:** সাহসী, সবসময় **তির-ধনুক-গুলতি** নিয়ে বনে ঘুরত। তার মনে ছিল **অহংকার**।
- **বাঘ:** শিকারির বন্ধু। সেও খুশি মনে বন্ধুর বাড়িতে এসেছিল। বাঘ **বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান** ছিল।
- **শিকারির বাবা:** যিনি দেওয়ালের ছবিটি এঁকেছিলেন।
**মূলভাব:** এই গল্পটি বোঝায় যে, কোনো ঘটনার বর্ণনা বা ছবি **কে আঁকছে বা বলছে**, তার **দৃষ্টিভঙ্গির** ওপর সত্যতা নির্ভর করে। **শক্তিশালীরাই** সবসময় নিজেদের জয়গান করে।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
অনেক দিন আগে বনের ধারে এক গাঁয়ে এক **শিকারি** থাকত। তার কোনো ভয় ছিল না, বরং **পশুপাখিরা** তাকে ভয় করত। একদিন বনে **এক বাঘের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব** হলো। শিকারির প্রস্তাবে বাঘ খুশি হয়ে তার বাড়িতে এলো।
বাঘ শিকারির **পরিষ্কার সুন্দর ঘরে** মাটির ঠান্ডা মেঝেয় বসে জল খেল। হঠাৎ তার চোখ গেল দেওয়ালের দিকে। সেখানে **হাতে-আঁকা** একটি ছবি ছিল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে: **একজন মানুষ (শিকারি) বিশাল এক বাঘকে মেরে তার পায়ের তলায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে**।
শিকারি গর্ব করে বলল, ছবিটি তার বাবা এঁকেছেন এবং তার ঠাকুরদাও মস্ত শিকারি ছিলেন। বাঘ তখন **গোঁফের ফাঁকে মুচকি হেসে** বিচক্ষণতার সঙ্গে বলল, **”ছবিটা যদি কোনো বাঘ আঁকত তাহলে অন্যরকম হতো।”** বাঘের এই উক্তিটির মাধ্যমে গল্পটি সমাপ্ত হয়, যা ক্ষমতার পার্থক্য এবং দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বকে তুলে ধরে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **ঘন বন** | গভীর জঙ্গল | অনেক দিন আগে দেশে **ঘন বন** ছিল। |
| **গুলতি** | ছোটো পাথর বা গুলি ছোঁড়ার দেশীয় অস্ত্র | শিকারির হাতে **তির-ধনুক-গুলতি** থাকত। |
| **আঁধার** | অন্ধকার | শিকারি **আঁধার** হওয়ার আগে বাড়ি ফিরত। |
| **দাওয়া** | বারান্দা, চাতাল | বাঘ দাওয়া পেরিয়ে ঘরে ঢুকল। |
| **ছিমছাম** | পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন | শিকারির ঘরটি ছিল **ছিমছাম** সুন্দর। |
| **লোটা** | ঘটি (জল রাখার ছোটো পাত্র) | শিকারি **লোটায়** করে ঠান্ডা জল এনে দিল। |
| **ডাগর** | বড়ো (এখানে বড়ো চোখ) | বাঘ **ডাগর** চোখে চেয়ে রইল। |
| **মুচকি** | মৃদু হাসি, চাপা হাসি | বাঘ গোঁফের ফাঁকে **মুচকি** হেসেছিল। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. গল্পের শিকারিটি কীভাবে তার দিন কাটাত?
শিকারি প্রতিদিন সকালে গাঁয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে **তির-ধনুক-গুলতি** নিয়ে বনে বনে ঘুরত। সে **গাছের ফল** খেত এবং **পাখি শিকার** করে বনেই রান্না করে খেত।
২. শিকারি ও বাঘের বন্ধুত্ব কীভাবে তৈরি হলো?
এমনি করে একদিন বনে **এক বাঘের সঙ্গে শিকারির দেখা** হলো। তারা অনেকক্ষণ **কথাবার্তা** বলল এবং এরপর **প্রায় প্রতিদিনই দেখা** হতো। এইভাবেই তাদের মধ্যে খুব **গভীর বন্ধুত্ব** তৈরি হলো।
৩. শিকারির ঘর-বাড়ির চেহারা কেমন ছিল?
শিকারির বাড়ি ছিল **মাঠের পাশে ফসলের জমির পাশে**। ছোটো দাওয়া পেরিয়ে ঘরে ঢুকলে দেখা যেত **ছিমছাম, পরিষ্কার সুন্দর ঘর**, যা **মাটির ঠান্ডা মেঝে** দিয়ে তৈরি।
৪. শিকারি তার বাড়িতে প্রিয় বন্ধুর যত্ন কীভাবে করেছিল?
শিকারি বাঘকে তার **মাটির ঠান্ডা মেঝেতে** বসতে দিয়েছিল। এরপর **লোটায় করে পুকুরের ঠান্ডা জল** এনে দিল, যা বাঘ জিভ দিয়ে চেটে চেটে খেল।
৫. দেয়ালে আঁকা ছবিটির বিষয় কী ছিল? ছবিটি কে এঁকেছিল?
দেয়ালে আঁকা ছবিটির বিষয় ছিল: **একজন মানুষ (শিকারি) বিশাল এক বাঘকে মেরে তার পায়ের তলায় রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে**। ছবিটি **শিকারির বাবা** এঁকেছিলেন।
৬. শিকারি কেন গর্ব করে তার ঠাকুরদা ও বাবার কথা বলল?
শিকারি দেয়ালে আঁকা **বাঘ মারার ছবিটি** দেখিয়ে গর্ব করে বলেছিল যে, তার **ঠাকুরদা ও বাবা**ও তার মতো **মস্ত শিকারি** ছিলেন। এর মাধ্যমে সে বাঘের সামনে নিজের **ক্ষমতা ও বংশের বীরত্ব** জাহির করতে চেয়েছিল।
৭. বাঘের কোন কথা শুনে শিকারি অবাক হয়েছিল?
শিকারি যখন গর্ব করে বলল যে ছবিটি তার বাবা এঁকেছেন, তখন বাঘ গোঁফের ফাঁকে মুচকি হেসে বলল, **”ছবিটা যদি কোনো বাঘ আঁকত তাহলে অন্যরকম হতো।”** বাঘের এই **বিচক্ষণ** কথা শুনে শিকারি অবাক হয়েছিল।
৮. শিকারি বনের পশুপাখিদের ভয় করত না কেন?
শিকারি বনের পশুপাখিদের ভয় করত না, কারণ সে সবসময় **তির-ধনুক-গুলতি** নিয়ে ঘুরত এবং তার **সাহসিকতা** ছিল। উলটে বনের **পশুপাখিই** তাকে ভয় করত।
৯. দেওয়ালের ছবিতে মানুষটি কেন বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে ছিল?
দেওয়ালের ছবিতে মানুষটি (শিকারি) **বিরাট কোনো কাজ করেছে**—অর্থাৎ বিশাল বাঘ মেরেছে—এই **গর্ব ও বিজয়ীর মনোভাব** দেখানোর জন্য সে বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে ছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. “ছবিটা যদি কোনো বাঘ আঁকত তাহলে অন্যরকম হতো।”— বাঘের এই উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
বাঘের এই উক্তিটি গল্পের **মূল ভাবনা** এবং একটি গভীর **দার্শনিক সত্য** বহন করে:
- **দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য:** এই উক্তিটি বোঝায় যে, **সত্য বা ইতিহাস** সবসময় **কে বলছে বা দেখাচ্ছে**, তার ওপর নির্ভর করে। মানুষ আঁকছে বলেই ছবিতে মানুষ জয়ী এবং বাঘ পরাজিত।
- **ক্ষমতার জয়গান:** বাঘ বোঝাতে চেয়েছে যে, **শক্তিশালী (মানুষ)** তার ক্ষমতা দিয়ে ছবি এঁকে **নিজের শ্রেষ্ঠত্ব** প্রতিষ্ঠা করছে। যদি বাঘ শক্তিশালী হতো, তবে ছবি অন্যরকম হতো—সেখানে মানুষ পরাজিত হতো।
- **বাস্তব উপলব্ধি:** বাঘের এই কথাটি শিকারির **অহংকারকে** চুরমার করে দেয় এবং পাঠককে মনে করিয়ে দেয় যে, **ক্ষমতাবানরাই** তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস রচনা করে।
২. গল্পের শিকারি ও বাঘের চরিত্রের তুলনামূলক আলোচনা করো।
শিকারি ও বাঘ উভয়ে বন্ধু হলেও, তাদের মধ্যে চারিত্রিক পার্থক্য ছিল:
| চরিত্র | শিকারি | বাঘ |
|---|---|---|
| **স্বভাব** | সাহসী কিন্তু অহংকারী, আত্ম-প্রচারক। | বিচক্ষণ, বন্ধুভাবাপন্ন, স্থিতধী। |
| **দৃষ্টিভঙ্গি** | সংকীর্ণ। নিজের বংশের বীরত্ব নিয়ে গর্ব করে। | দূরদর্শী। ক্ষমতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বোঝে। |
| **উদ্দেশ্য** | বাঘকে ভয় দেখাতে ও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। | শিকারির বাড়িতে বন্ধুর মতো এসেছিল, কিন্তু সত্য বুঝতে পেরেছিল। |
| **মূল্যায়ন** | দেওয়ালের ছবিতে জয়ী মানুষকেই সে ‘বিরাট’ কাজ করা বলে মনে করে। | শিকারির অহংকারকে মুচকি হাসি ও যুক্তির মাধ্যমে ভেঙে দেয়। |
শিকারি ছিল **শরীরে শক্তিশালী** কিন্তু **জ্ঞানে অপরিপক্ব**, আর বাঘ ছিল **বিচক্ষণ ও দার্শনিক**।
৩. দেওয়ালের ছবির মতো ঘটনাগুলি নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কী হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করো।
দেওয়ালের ছবির ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, একটি ঘটনাকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়:
- **শিকারির দৃষ্টিকোণ (ক্ষমতাবানের):** শিকারি মনে করে, মানুষই শ্রেষ্ঠ এবং মানুষই বাঘকে মেরে বীরত্ব দেখিয়েছে। এটি **অহংকার** এবং **মানবিক শ্রেষ্ঠত্বের** দিক।
- **বাঘের দৃষ্টিকোণ (দুর্বলের):** বাঘ বোঝে যে, যদি শিকারি তার চেয়ে দুর্বল হতো, তবে ছবিটিতে **বাঘের শিকার** হওয়ার দৃশ্য থাকত। এটি **ক্ষমতার অপব্যবহার** ও **ইতিহাসের বিকৃতিকে** তুলে ধরে।
- **নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ:** নিরপেক্ষভাবে দেখলে, ছবিটিতে কেবল একটি **লড়াইয়ের ফলাফল** দেখানো হয়েছে। ছবিটি আঁকা হতো নিরপেক্ষভাবে, যদি সেখানে শুধু জয়-পরাজয় নয়, বরং **বাঘের শক্তির প্রতি শ্রদ্ধাও** দেখানো হতো।
এই গল্পটি আমাদের শেখায় যে, **কোনো ঘটনার বর্ণনা শোনার আগে বক্তার অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি জানা** জরুরি।