বাংলা সাহিত্য (তৃতীয় শ্রেণি)
অষ্টম পাঠ: মনকেমনের গল্প (নবনীতা দেবসেন) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত স্মৃতিকথা/প্রবন্ধ | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** বর্ষার দিনে শৈশবের একাকীত্ব, বিষণ্ণতা ও কল্পনাবিলাস।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**নবনীতা দেবসেন (১৯৩৮-২০১৯):** তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর সাহিত্যকর্মগুলি সাধারণত **নারী জীবন, ভ্রমণ** এবং **শিশু মনস্তত্ত্বকে** কেন্দ্র করে রচিত হতো। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে—**’প্রথম প্রত্যয়’, ‘আমি অনুপম’** এবং **’খুশির হাওয়া’**। তিনি **সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার**, **পদ্মভূষণ** সহ বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। আলোচ্য পাঠটি তাঁর লেখা স্মৃতিকথামূলক রচনার অংশ।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
গল্পটি একটি **বৃষ্টিভেজা, মেঘলা দিনের** প্রেক্ষাপটে রচিত, যখন লেখকের মন খারাপ লাগছিল। **দিনের আলো ঘোলা** হয়ে আসছিল, এবং সারাদিন ধরেই আকাশ মেঘলা ছিল। এই সময় তিনি তাঁর **স্কুল জীবনের** কথা মনে করেন।
১. **বিষণ্ণ পরিবেশ:** এই মেঘলা দিনগুলো এমন ছিল যে বাইরে বেরিয়ে খেলা করা যেত না। মনে হতো যেন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসছে। চারিদিকের **গাছপালাও** যেন **’উদাস’** হয়ে থাকত। ২. **মন খারাপের কারণ:** এই দিনগুলোতে ছুটি থাকলেও, বাড়িতে **একা একা** থাকায় লেখকের মন খারাপ লাগত। তাঁর মন চাইত দূরে কোথাও বেরিয়ে পড়তে। ৩. **কল্পনা:** বৃষ্টির দিনে জানলার ধারে বসে তিনি দেখতেন, মেঘ ভেঙে **একটা আলোর ছটা** আসছে। তিনি কল্পনা করতেন যে সেই মেঘ বুঝি তাঁকে তাঁর **’দূর কোনো মিষ্টি বন্ধুর’** বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাবে।
গল্পটি বোঝায় যে, বর্ষার মেঘলা দিনে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে আমাদের **মনের ভেতরের বিষণ্ণতা** কীভাবে মিশে যায়।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **মনকেমন** | বিষণ্ণতা, মন খারাপ লাগা | মেঘলা দিনে লেখকের **মনকেমন** করত। |
| **মেঘলা** | মেঘে ঢাকা, বাদলা | **মেঘলা** দিনগুলোতে মন বসত না। |
| **উদাস** | অন্যমনস্ক, আনমনা, বৈরাগ্যভাব | গাছপালাও যেন **উদাস** হয়ে থাকত। |
| **ঝাঁপালো** | ঝাঁকড়া, ঘন (এখানে পাতার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত) | **ঝাঁপালো** পাতার শব্দে মন খারাপ হতো। |
| **বেবুশ্যে** | বেহুঁশ, অচেতন | স্কুলের ছুটিতে বেড়াতে না যেতে পেরে বেবুশ্যে লাগে। |
| **ছটা** | আলোর ঝলক, তীব্র দীপ্তি | মেঘ ভেঙে আলোর **ছটা** আসত। |
| **কোথাও** | কোনো এক জায়গায় | মন চাইত দূরে **কোথাও** যেতে। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. লেখক কখন মনকেমনের গল্প মনে করতেন?
যখন দিনের আলো **ঘোলা** হয়ে আসত এবং **আকাশ সারাদিন মেঘলা** থাকত, সেই বর্ষার দিনগুলোতে লেখকের **মনকেমনের গল্প** মনে হতো।
২. স্কুল বন্ধ থাকলেও লেখকের মন বসত না কেন?
স্কুল বন্ধ থাকলেও **সারাদিন আকাশ মেঘলা** থাকত এবং **বাইরে বেরোনোর উপায়** থাকত না। বাড়িতে **একা একা** বসে থাকায় এবং এই বিষণ্ণ পরিবেশের কারণে লেখকের মন বসত না।
৩. মেঘলা দিনে গাছপালা কেমন দেখাত?
মেঘলা দিনে গাছপালাগুলো যেন **উদাসী** হয়ে যেত। বাতাসের ঢেউয়ে তাদের **ঝাঁপালো পাতার শব্দে** লেখকের আরও মন খারাপ হতো।
৪. জানলার ধারে বসে লেখক কী কল্পনা করতেন?
জানলার ধারে বসে লেখক কল্পনা করতেন যে, **মেঘ ভেঙে আসা আলোর ছটা** বুঝি তাঁকে তার **’দূর কোনো মিষ্টি বন্ধুর’** বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাবে।
৫. লেখকের মায়ের কথা অনুযায়ী আকাশটা কেমন ছিল?
লেখকের মা বলতেন, **দূরে কোথাও বৃষ্টি পড়ছে**, আর এই আকাশটা যেন তার **ঘোমটা**। অর্থাৎ আকাশটা তখন বৃষ্টিতে ভেজা এবং **অস্পষ্ট (ভারি)** ও **ক্লান্ত** ছিল।
৬. ‘বেবুশ্যে দিনগুলো’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
**’বেবুশ্যে দিনগুলো’** বলতে সেই দিনগুলিকে বোঝানো হয়েছে, যখন ছুটি থাকলেও **সারাদিন মেঘলা** থাকায় কোনো কাজ বা **আনন্দ** খুঁজে পাওয়া যায় না। দিনগুলো তখন যেন **আলস্যে ও নিরুত্তেজনায়** কেটে যায়।
৭. মেঘলা দিনে লেখকের মনে কীসের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতো?
মেঘলা দিনে লেখকের মনে ঘরের বদ্ধতা ছেড়ে **দূর কোথাও বেরিয়ে পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা** তৈরি হতো। তাঁর মন চাইত দূরে কোনো **মিষ্টি বন্ধুর বাড়িতে** বেড়াতে যেতে।
৮. বর্ষার দিনে লেখক কোথায় বসে বাইরের দৃশ্য দেখতেন?
বর্ষার দিনে লেখক **ক্রিসমাসের জানলা** দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতেন। এই জানলা দিয়েই তিনি মেঘ ভেঙে আসা আলোর ছটা দেখতে পেতেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘মনকেমনের গল্প’ প্রবন্ধটিতে লেখকের মনে মন খারাপ হওয়ার কারণগুলি আলোচনা করো।
মেঘলা দিনে লেখকের মন খারাপ হওয়ার প্রধান কারণগুলি হলো:
- **প্রাকৃতিক বিষণ্ণতা:** সারাদিন **আকাশ মেঘলা** থাকত এবং দিনের আলো **ঘোলা** হয়ে যেত। এই প্রাকৃতিক বিষণ্ণতা তাঁর মনকে বিষাদে ভরিয়ে তুলত।
- **আলস্য ও একাকীত্ব:** স্কুল ছুটি থাকলেও বাইরে খেলার উপায় থাকত না। বাড়িতে **একা একা** বসে থাকায় তাঁর মন বসত না এবং তিনি **আলস্য** অনুভব করতেন।
- **আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা:** তাঁর মন চাইত দূরে কোথাও, **মিষ্টি বন্ধুর বাড়িতে** বেড়াতে যেতে। কিন্তু যেতে না পারার কারণে তাঁর মনে **অপূর্ণতার কষ্ট** তৈরি হতো।
- **বাতাসের শব্দ:** বাতাসের ঢেউয়ে **ঝাঁপালো পাতার শব্দ** যেন আরও বেশি **উদাসী ও আনমনা** করে তুলত।
২. মেঘলা দিনের পরিবেশ কীভাবে লেখকের মনে কল্পনার জন্ম দিয়েছিল?
মেঘলা দিনের বিষণ্ণ পরিবেশে লেখক কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলেন:
- **আলোর ছটা:** জানলার ধারে বসে তিনি যখন মেঘ ভেঙে আসা **আলোর ছটা** দেখতেন, তখন তিনি কল্পনা করতেন যে মেঘ বুঝি তাঁকে **বেড়াতে নিয়ে যেতে** এসেছে।
- **উদ্দেশ্য:** এই কল্পনা তাঁর **মন খারাপ** দূর করতে সাহায্য করত। তিনি চাইতেন মেঘ তাঁকে তার **মিষ্টি বন্ধুর বাড়িতে** নিয়ে যাক।
- **মায়ের কথা:** মা যখন আকাশকে **ঘোমটা** বলে বর্ণনা করতেন, তখন লেখকের মনে হতো যেন আকাশটি সত্যি সত্যিই **ভারী ও ক্লান্ত** কোনো মানুষ।
এইভাবে মেঘলা দিনের বিষণ্ণতাই লেখকের মনকে **বাস্তব ছেড়ে কল্পনার জগতে** নিয়ে গিয়েছিল।
৩. ‘মনকেমনের গল্প’ নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
গল্পটির নামকরণ **’মনকেমনের গল্প’** সম্পূর্ণরূপে সার্থক হয়েছে:
- **কেন্দ্রীয় ভাব:** গল্পের মূল বিষয় হলো **বর্ষার মেঘলা দিনে লেখকের মনে জেগে ওঠা একাকীত্ব ও বিষণ্ণতার** অনুভূতি (মনকেমন)। এই অনুভূতিই গল্পটির কেন্দ্র।
- **স্মৃতিকথা:** গল্পটিতে লেখক তাঁর **শৈশবের এক বিশেষ সময়ের স্মৃতিচারণ** করেছেন, যখন তিনি বাইরে বেরোতে না পেরে বাড়িতে বসে থাকতেন এবং তাঁর মন খারাপ হতো।
- **আকর্ষণ:** ‘মনকেমনের গল্প’ নামটি সরল হলেও তা পাঠককে লেখকের **ব্যক্তিগত অনুভূতি** এবং তাঁর **কল্পনাপ্রবণ মনের** সঙ্গে সহজেই যুক্ত করে তোলে।
গল্পটি যেহেতু **বিষণ্ণতা ও কল্পনার মিশ্রণে** তৈরি, তাই এই নামকরণই সবচেয়ে উপযুক্ত।