চতুর্থ পাঠ: সোনা (নোট)
প্রসেসিং হচ্ছে…

বাংলা সাহিত্য (তৃতীয় শ্রেণি)

চতুর্থ পাঠ: সোনা (গৌরী ধর্মপাল) – নোটস ও উত্তর

**উৎস:** সংকলিত | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** প্রকৃত সম্পদ, নদীর মহিমা এবং পরিবেশ সচেতনতা।

১. লেখক পরিচিতি (Author Information)

**গৌরী ধর্মপাল (জন্ম ১৯৩১):** তিনি ছিলেন সংস্কৃতের বিখ্যাত অধ্যাপক। বড়দের জন্য তিনি **’বেদের কবিতা’** এবং **’পঞ্চতন্ত্র’ ও ‘কাদম্বরী’**-র মতো অনুবাদ গ্রন্থ লিখেছেন। তিনি ছোটোদের জন্যও লিখেছেন—তাঁর লেখা বইগুলির কয়েকটি হলো—**’ঘোড়া যায়’, ‘চোদ্দো পিদিম’, ‘আশ্চর্য কৌটো’** এবং **’কালো মানিক’**। তিনি **’মালশ্রীর পঞ্চতন্ত্র’** এবং **’আটটি আপেল’** নামে বিদেশি রূপকথার অনুবাদও করেছেন।

২. সারসংক্ষেপ (Summary)

গল্পটি চাষির মেয়ে **সোনাকে** নিয়ে লেখা। সোনা যখন ছোটো ছিল, তখন তার বাবা-মা উঠোনে বেড়া দিয়ে তাকে সুরক্ষিত রাখত। মা-এর ইচ্ছে ছিল মেয়ের হাতে **সোনার কাঁকন** পরাবেন। কিন্তু সোনার দাম বেশি এবং চুরির ভয় ছিল।

একদিন নদীতে নাইতে গিয়ে বাপ-মা দেখেন, মেয়ের সারা গায়ে **বালি চিকচিক** করছে। অনেক মোছার পরেও যখন বালি ঝরল না, তখন চাষি বুঝতে পারল যে, এ তো বালি নয়, এ হলো **সোনা**! নদীমা যেন তাকে গয়না পরিয়ে দিয়েছেন। সেই থেকে গ্রামের নাম হলো **সোনারগাঁ**।

একবার **চোর সোনাকে চুরি** করে নিয়ে যাচ্ছিল। সোনা চিৎকার করলে মা ঘণ্টা বাজিয়ে গাঁয়ের লোকদের ডাকেন। সরকারের লোকও নদীতে **সোনা খুঁজতে** এসেছিল। কিন্তু তারা খুব কম সোনা পাওয়ায় কাজ বন্ধ করে দেয়। সোনা বড়ো হয়ে **পাঠশালে উঁচু ক্লাসে** পড়ে। সংস্কৃতের দিদিমণি তার নাম দেন **’নদীমাতৃকা’**। সোনা নদীকে নোংরা করা থেকে সবাইকে আটকায় এবং বলে, **নদী আমাদের সত্যিকারের মা**।

৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)

বাংলা শব্দ অর্থ প্রাসঙ্গিকতা
**কাঁকন** হাত বা মণিবন্ধের গয়না, চুড়ি সোনার মা তাকে **কাঁকন** পরাতে চেয়েছিলেন।
**আশ্চয্যি** অবাক, বিস্মিত গাঁ-সুদ্ধ সবাই সোনাকে দেখে **আশ্চয্যি** মানে।
**নাইতে** স্নান করতে, গোসল করতে একদিন সোনাকে নিয়ে নদীতে **নাইতে** গিয়েছিল।
**নিরীক্ষণ** ভালো করে দেখা, পরীক্ষা করা চাষি ভালো করে **নিরীক্ষণ** করে সোনা চিনল।
**চম্পট** পালিয়ে যাওয়া চোর সোনাকে তুলে নিয়ে **চম্পট** দেয়।
**নদীমাতৃকা** নদী যার মায়ের মতন দিদিমণি সোনার নাম রেখেছিলেন **নদীমাতৃকা**।
**হিরণ্যবক্ষা** যার বুকে সোনা থাকে নদীমা **হিরণ্যবক্ষা** ঢেউ দুলিয়ে হাসেন।
**পিশাচ** দৈত্য, খারাপ লোক (এখানে খারাপ কাজ করা মানুষ) নদীকে নোংরা করলে সোনা তাদের **পিশাচ** বলে।

৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)

(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):

১. সোনা কে? তার বাবা-মা কেন বাড়িতে বেড়া দিয়েছিলেন? [২ নম্বর]

সোনা ছিল এক **চাষির মেয়ে**। যখন সে ছোটো ছিল এবং উঠোনে হামাগুড়ি দিত, তখন সে যেন বাইরে বেরিয়ে না যায়, তাই বাবা-মা উঠোনে **নরম লতা** দিয়ে ঢেকে **বেড়া** দিয়ে তাকে সুরক্ষিত রেখেছিলেন।

২. নদীমা কীভাবে সোনার সারা গায়ে গয়না পরিয়ে দিয়েছিলেন? [২ নম্বর]

সোনাকে নদীতে স্নান করানোর পর দেখা যায়, তার সারা গায়ে **বালি চিকচিক** করছে। অনেক মোছা বা ঝাড়ার পরেও সেই বালি ঝরল না। চাষি তখন বুঝতে পারল যে, এটি **বালি নয়, নদীমায়ের দেওয়া সোনা**।

৩. কেন গ্রামটির নাম ‘সোনারগাঁ’ হলো? [২ নম্বর]

চাষির মেয়ে **সোনা**-কে নিয়ে চোর পালানোর পর যখন তাকে ধরা হয়, তখন সরকারের লোক সোনাকে দেখে **নদীতে সোনা খুঁজতে** এসেছিল। যদিও তারা কম সোনা পায়, তবুও এই ঘটনার কারণে সেই গাঁয়ের নাম **সোনারগাঁ** হয়ে গেল।

৪. সরকারের লোকেরা কী কাজ করবে বলে সোনাদের গ্রামে এসেছিল? তারা কি সফল হয়েছিল? [২ নম্বর]

সরকারের লোকেরা **নদীর জলে সোনা খুঁজতে** এসেছিল। তারা **যন্ত্রপাতি** নিয়ে নদীতে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছিল। কিন্তু তারা **খুব কম সোনা** পাওয়ায় কাজ বন্ধ করে চলে যায়। তাই তারা সফল হয়নি।

৫. সোনার নাম ‘নদীমাতৃকা’ কে রেখেছিলেন? এই নামের অর্থ কী? [২ নম্বর]

সোনা যখন বড়ো হয়ে পাঠশালে উঁচু ক্লাসে পড়ত, তখন তার **সংস্কৃতের দিদিমণি** তার নাম রেখেছিলেন **’নদীমাতৃকা’**। এই নামের অর্থ হলো **নদী যার মায়ের মতন**।

৬. চোর সোনাকে কখন চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল? মা তখন কী করেছিলেন? [২ নম্বর]

বাবা ক্ষেতে গিয়েছিল এবং মা রান্নাঘরে দুধ জ্বাল দিচ্ছিল, সেই সময় **দুধ উথলোব-উথলোব** করছে—এমন সময় **চোর সোনাকে চুরি** করে নিয়ে গিয়েছিল। মা তখন **পাগলের মতো ঘরের ঘণ্টা** বাজাতে লাগলেন।

৭. নদীমা কেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন? [২ নম্বর]

সরকারের লোকেরা নদীতে **যন্ত্রপাতি বসিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি** করায় নদীমায়ের কষ্ট হচ্ছিল। তারা যখন পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেল, তখন **খোঁড়াখুঁড়ির ময়লা বেরিয়ে নদীর তলা পরিষ্কার হলো** এবং বুকের ওপর দম-আটকানো নল সরিয়ে ফেলায় নদীমা **হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন**।

৮. সোনা কেন নদীকে ‘মা’ বলে মনে করত? [২ নম্বর]

সোনা মনে করত, নদী হলো **তার সত্যিকারের মা**। নদী মানুষকে **জল জোগান** দেয়, **ফসল ফলাতে** সাহায্য করে এবং **সোনা** (স্বর্ণরেণু) দিয়েছিল। তাই নদীকে নোংরা করা তার কাছে মায়ের গায়ে কাদা ছোঁড়ার সমান ছিল।

৯. নদীকে নোংরা করলে সোনা কী করত? [২ নম্বর]

কেউ নদীকে নোংরা করলে সোনা ঠিক **টের পেত**। সে **বাঘিনির মতো ছুটে আসত**, একজনকে **আধমরা** করে ছেড়েছিল এবং কারখানা থেকে নোংরা জল পড়া **ধরনা দিয়ে বন্ধ** করিয়েছিল।

রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):

১. ‘সোনা’ গল্পে নদীমাতৃকা সোনা কীভাবে তার নামের সার্থকতা প্রমাণ করেছিল? [৫ নম্বর]

সোনার দিদিমণি তার নাম দিয়েছিলেন **’নদীমাতৃকা’** (নদী যার মা)। সোনা তার কাজের মাধ্যমে এই নামের সার্থকতা প্রমাণ করেছে:

  • **নদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা:** নদী তাকে সোনা দিয়ে গয়না পরিয়েছিল। তাই সে নদীকে **’মা’** বলে মনে করত।
  • **নদীর সুরক্ষা:** বড় হওয়ার পর সোনা নদীর প্রতি **অত্যন্ত সচেতন** হয়। কেউ নদীকে নোংরা করলে বা কারখানা বসিয়ে নোংরা জল ফেললে সে **বাঘিনির মতো ছুটে এসে** বাধা দিত এবং ধরনা দিয়ে তা বন্ধ করিয়েছিল।
  • **জনসচেতনতা:** সে গ্রামবাসীদের বোঝাত যে, নদী শুধু জল নয়, **”নদী যে মা, সত্যিকারের মা”**।

সোনার এই **পরিবেশ সচেতনতা ও নদীর প্রতি ভালোবাসা** তার ‘নদীমাতৃকা’ নামের সার্থকতা প্রমাণ করেছে।

২. সোনাকে নিয়ে চোর পালানো এবং সরকারের সোনা খোঁজার ঘটনার বর্ণনা দাও। [৫ নম্বর]

**চোর পালানো:** সোনা যখন উঠোনে একা খেলছিল, তখন এক চোর এসে তাকে তুলে নিয়ে **চম্পট** দেয়। মা পাগলের মতো ঘরের ঘণ্টা বাজালে **সারা গাঁ ছুটে আসে** এবং চোরকে ধরে ফেলে।

**সোনা খোঁজা:** চোর ধরার সময় **সরকারের লোক** বড় রাস্তায় গাড়ি নিয়ে আসছিল। তারা সোনাদের গাঁয়ের নদীতে সোনা থাকার কথা শুনে **যন্ত্রপাতি নিয়ে খুঁজতে** এসেছিল। কিন্তু তারা খুব **কম সোনা** পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত **পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যায়**। তাদের এই খোঁড়াখুঁড়িতে নদীমার কষ্ট হলেও, তারা চলে গেলে নদীমা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।

৩. ‘নদী যে মা, সত্যিকারের মা।’— কেন সোনা এমন মন্তব্য করেছিল? নদী আমাদের কী কী উপকার করে? [৫ নম্বর]

সোনা এমন মন্তব্য করেছিল, কারণ নদী তার কাছে ছিল **স্নেহ, জীবন ও সম্পদের** উৎস:

  • **জীবনের উৎস:** নদী **জল** দেয়, যা ছাড়া জীবন অসম্ভব। সোনা তার বন্ধুদের বলেছিল, **”জল-কে-জল। দুধ-কে-দুধ!”**
  • **সম্পদ ও আশীর্বাদ:** নদী সোনার গায়ে **সোনা** (স্বর্ণরেণু) দিয়েছিল। নদী **দু-কূল ভরে ফসল** ফলাতে সাহায্য করে।
  • **মায়ের সঙ্গে তুলনা:** সোনা মনে করে, নদীকে নোংরা করা হলো **মায়ের গায়ে কাদা ছোঁড়ার** সমান অপরাধ।

নদীমাতৃকা হিসেবে সোনা এই মন্তব্যের মাধ্যমে নদীকে **পূজনীয় ও অপরিহার্য** হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu