বাংলা সাহিত্য (তৃতীয় শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ: ফুল (সুখলতা রাও) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত গল্প | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** ফুল সৃষ্টির কাল্পনিক লোককথা, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পরিদের রহস্যময় জগৎ।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**সুখলতা রাও (১৮৮৬-১৯৬৯):** তিনি ছিলেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক **উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জ্যেষ্ঠা কন্যা**। রায়চৌধুরী পরিবারের সাংস্কৃতিক আবহে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তিনি ইংরেজি ও বাংলা—উভয় ভাষাতেই বহু বই লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলি হলো—**’আরো গল্প’, ‘খোকা এল বেড়িয়ে’, ‘নতুন ছড়া’** প্রভৃতি। তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদ।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘ফুল’ গল্পটি একটি **রূপকথা**, যা ফুল সৃষ্টির রহস্য বর্ণনা করে। **অনেক অনেক কাল আগে** যখন পৃথিবীতে মানুষ জন্মায়নি, তখন কেবল **বড়ো বড়ো ঘাস আর পাতা গাছ** ছিল। পৃথিবীতে কোনো ফুল ছিল না। আলো ও বাতাস ফুলদের খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ হতো।
এক রাতে **ফুলপরিরা** (যারা ফুলের পাপড়ির পোশাক পরে, ফুলের মধু খায়) পৃথিবীর পাতা-ভরা বাগানে নেমে আসে। তারা অবাক হয়ে দেখে, এত **চমৎকার** জায়গায় কোনো ফুল নেই! তাই তারা সকলে মিলে তাদের দেশ থেকে **অনেক ফুলের বীজ** নিয়ে আসে এবং তা মাঠে মাঠে, বনে বনে ছড়িয়ে দেয়। সেই বীজ থেকে গাছ গজায় এবং তাতে **সাদা, নীল, হলদে, লাল, বেগুনি**—নানা রঙের ফুল ফুটে বন ছেয়ে যায়।
এখনও নাকি **ফুলপরিরা** পৃথিবীতে নেমে আসে। তবে তারা **গভীর জঙ্গলের** ভিতর আসে, যেখানে মানুষরা থাকে না। সারা রাত তারা **ফুলবনে হাত ধরাধরি করে নাচে** এবং ভোর না হতেই চলে যায়। সকালে সেখানে গেলে তাদের **পায়ের চাপে ঘাস শুয়ে** পড়া দেখতে পাওয়া যায়।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **কাল** | সময় | অনেক অনেক **কাল** আগে ফুল ছিল না। |
| **ফুলপরি** | রূপকথার কল্পিত সুন্দরী মেয়ে (পাখির মতো ডানাযুক্ত) | **ফুলপরিরা** তাদের দেশ থেকে ফুলের বীজ এনেছিল। |
| **পাপড়ি** | ফুলের অংশবিশেষ, Petals | পরিরা ফুলের **পাপড়ির পোশাক** পরে। |
| **মধু** | ফুল থেকে মৌমাছিরা যা সংগ্রহ করে, এখানে ফুলের নির্যাস | পরিরা ফুলের **মধু** খায়। |
| **চমৎকার** | খুব সুন্দর, মনোহর | এত **চমৎকার** জায়গায় ফুল নেই কেন? |
| **বীজ** | অঙ্কুরোদগমের জন্য ব্যবহৃত দানা | ফুলপরিরা তাদের দেশ থেকে ফুলের **বীজ** নিয়ে আসে। |
| **ছেয়ে গেল** | ভরে গেল, ঢেকে গেল | নানা রঙের ফুলে বন **ছেয়ে গেল**। |
| **কুঁড়ি** | ফুলের প্রাথমিক অবস্থা, কলি | গাছে গাছে নানা রঙের ফুলের **কুঁড়ি** দেখা দিল। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. কোন সময় পৃথিবীতে কোনো ফুল ছিল না? তখন পৃথিবী কেমন ছিল?
অনেক অনেক **কাল আগে**, যখন **মানুষ জন্মায়নি**, তখন পৃথিবীতে কোনো ফুল ছিল না। তখন মাটির উপর ছিল কেবল **বড়ো বড়ো ঘাস আর পাতা গাছ**।
২. ফুলপরিরা কেমন পোশাক পরে এবং কী খায়?
ফুলপরিরা তাদের দেশ থেকে আনা **ফুলের পাপড়ির পোশাক** পরে এবং **ফুলের মধু** খায়।
৩. ফুলপরিরা কেন পৃথিবীতে নেমে এসেছিল?
ফুলপরিরা পৃথিবীতে নেমে এসেছিল কারণ তারা দেখে যে এত **চমৎকার জায়গায়** কোনো ফুল নেই। তাই তারা তাদের দেশ থেকে **ফুলের বীজ** এনে পৃথিবীতে ফুল ফোটানোর জন্য এসেছিল।
৪. ফুলপরিদের আনা বীজ থেকে কী কী রঙের ফুল ফুটেছিল?
ফুলপরিদের আনা বীজ থেকে যে ফুল ফুটেছিল, তাতে **সাদা, নীল, হলদে, লাল এবং বেগুনি**—এই নানা রঙের ফুল ফুটেছিল।
৫. ফুল ফোটার পর আলো, বাতাস ও মৌমাছি কী করেছিল?
ফুল ফোটার পর **আলো** এসে তাদের গায়ে **হাত বুলিয়ে** দিল। **বাতাস** তাদের **দুলিয়ে** দিয়ে গেল। আর **মৌমাছিরা** ছুটে এল **মধু খেতে**।
৬. ফুলপরিরা এখন কোথায় নেমে আসে এবং কেন?
ফুলপরিরা এখনও পৃথিবীতে আসে, তবে তারা **গভীর জঙ্গলের** ভিতর নামে, **যেখানে মানুষরা থাকে না**। তারা লোকালয় এড়িয়ে **ফুলবনে হাত ধরাধরি করে নাচার** জন্য আসে।
৭. ফুলপরিরা রাতে নাচলে সকালে তার প্রমাণ কী দেখতে পাওয়া যায়?
ফুলপরিরা রাতে ফুলবনে সারা রাত নাচে। ভোর না হতেই তারা চলে গেলে, সকালে সেখানে গেলে নাকি দেখতে পাওয়া যায়—তাদের **পায়ের চাপে ঘাস শুয়ে পড়েছে**।
৮. কেন আগে আলো ও বাতাস ফুলদের খুঁজে খুঁজে যেত?
যখন পৃথিবীতে ফুল ছিল না, তখন **আলো** তার সৌন্দর্য ছড়াতে এবং **বাতাস** তার সুগন্ধ খুঁজে বেড়াত। কিন্তু ফুল না থাকায় তারা সেই সৌন্দর্য ও গন্ধ পাচ্ছিল না, তাই তাদের ফুলদের খুঁজে যেতে হতো।
৯. ফুলপরিদের দেশ কেমন ছিল?
ফুলপরিদের দেশে **অনেক ফুল** ছিল। সেখানকার পরিরা ফুলের **পাপড়ির পোশাক** পরত এবং **ফুলের মধু** খেত। তাদের দেশে ফুলের প্রাচুর্য ছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘ফুল’ গল্পে ফুলপরিরা কীভাবে পৃথিবীতে ফুল ফোটাল, তা বর্ণনা করো।
অনেক অনেক কাল আগে পৃথিবীতে ফুল ছিল না। তখন কেবল ঘাস ও পাতা গাছ ছিল। ফুলপরিরা তাদের দেশ থেকে পৃথিবীতে নেমে এসে দেখে, এত সুন্দর জগতে ফুল নেই! এই অভাব দূর করার জন্য:
- **বীজ সংগ্রহ:** তারা সকলে মিলে তাদের দেশ থেকে **অনেক ফুলের বীজ** সংগ্রহ করে।
- **বীজ ছড়ানো:** সেই বীজ তারা **মাঠে মাঠে ও বনে বনে** ছড়িয়ে দেয়।
- **ফুল সৃষ্টি:** সেই বীজ থেকে গাছ গজায় এবং তাতে নানা রঙের **ফুলের কুঁড়ি** দেখা দেয়। সেই কুঁড়ি ফুটে **সাদা, নীল, হলদে, লাল, বেগুনি** ফুলে বন ছেয়ে যায়।
ফুল ফোটার পর আলো, বাতাস ও মৌমাছিরা এসে সেই নতুন ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করে। এইভাবে ফুলপরিদের দয়ায় পৃথিবীতে ফুলের আগমন ঘটে।
২. ফুলপরিদের রহস্যময় জীবনযাত্রা ও স্বভাবের পরিচয় দাও।
ফুলপরিদের জীবনযাত্রা ছিল রহস্যময় ও মায়াবী:
- **আবাস:** তারা তাদের দেশে থাকত, যেখানে অনেক ফুল ছিল। তবে তারা মাঝেমধ্যে **পৃথিবীর গভীর জঙ্গলে** নেমে আসত।
- **পোশাক ও খাদ্য:** তাদের পোশাক ছিল **ফুলের পাপড়ির** তৈরি এবং তারা **ফুলের মধু** খেত।
- **স্বভাব:** তারা ছিল **পরোপকারী**, কারণ তারা পৃথিবীতে ফুল এনে এই জগৎকে আরও সুন্দর করে তুলতে চেয়েছিল।
- **রহস্যময়তা:** তারা **মানুষের কাছে আসত না**। রাত হলে, চাঁদ উঠলে, তারা ফুলবনে **হাত ধরাধরি করে নাচত** এবং ভোর না হতেই চলে যেত। তাদের **পায়ের চাপে শুয়ে থাকা ঘাস** তাদের নাচের একমাত্র প্রমাণ।
৩. ‘আলো এসে ফুলদের খুঁজে খুঁজে যেত। বাতাস পাতা শুঁকে শুঁকে চলে যেত।’— পঙ্ক্তি দুটির মাধ্যমে লেখক প্রকৃতির কোন অনুভূতিকে তুলে ধরেছেন?
এই পঙ্ক্তি দুটির মাধ্যমে লেখক **প্রকৃতির উপাদানের মানবিক অনুভূতিকে** তুলে ধরেছেন:
- **আলোর আকাঙ্ক্ষা:** **আলো** (সূর্য) চায় তার উজ্জ্বলতাকে প্রতিফলিত করার জন্য **ফুলদের সৌন্দর্য**। ফুল না থাকায় আলো যেন সেই সৌন্দর্য **খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ** হচ্ছে।
- **বাতাসের আকাঙ্ক্ষা:** **বাতাস** সাধারণত ফুলের সুগন্ধ বহন করে। ফুল না থাকায় বাতাস সেই **গন্ধ শুঁকে শুঁকে চলে যেত**, যা তার **সার্থকতার অভাবকে** প্রকাশ করে।
- **অপূর্ণতা:** এই রূপকটি বোঝায় যে, প্রকৃতিতে **প্রতিটি উপাদানেরই একে অপরের প্রয়োজন**। ফুল না থাকলে পৃথিবী **অপূর্ণ** থাকে, এমনকি আলো ও বাতাসও তাদের স্বাভাবিক ভূমিকা পালন করতে পারে না।
এটি প্রকৃতির **পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষাকে** তুলে ধরেছে।