বাংলা সাহিত্য (তৃতীয় শ্রেণি)
সপ্তদশ পাঠ: আরাম (শঙ্খ ঘোষ) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত ছড়া | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** সকালের শান্তি, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং মনের স্বস্তি।
—১. কবি পরিচিতি (Author Information)
**শঙ্খ ঘোষ (১৯৩২-২০২১):** তাঁর আসল নাম **চিত্তপ্রিয় ঘোষ**। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি। তাঁর ছড়া ও কবিতাগুলি গভীর অর্থ বহন করলেও সরল ভাষায় রচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো—**’দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’** এবং **’পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’**। তিনি **জ্ঞানপীঠ পুরস্কার** সহ বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘আরাম’ ছড়াটিতে কবি একটি **ভোরবেলার** ছবি এঁকেছেন, যেখানে শিশুটির ঘুম ভেঙেছে। ঘুম ভেঙে সে দেখল, **পাখিদের কূজনে** (মিষ্টি ডাকে) সকাল হয়েছে। তার **পাশে দুই দিকে বাবা ও মা** দুজনেই শুয়ে আছেন। অন্য ঘরে **দিদি (জিজি) বেঘোরে** (গভীর ঘুমে) ঘুমোচ্ছে, আর ঘরের পুতুলেরা যেন **টুংটাং** শব্দে নেচে উঠেছে।
এই শান্ত পরিবেশে সবকিছুই **ঠিকঠাক** আছে। একপাশে **আজান** এবং অন্য পাশে **সিয়ারাম** (সীতারাম) ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এই **নিরাপত্তা, পারিবারিক সান্নিধ্য এবং শান্ত ধর্মীয় পরিবেশ**—সবকিছু মিলিয়ে শিশুটির মনে **’আঃ! আজ কী আরাম!’**—এই অনুভূতি তৈরি হয়েছে। ছড়াটি **সুখ ও স্বস্তির** এক সুন্দর চিত্র তুলে ধরেছে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **কূজন** | পাখির মিষ্টি ডাক বা গান | পাখিদের **কূজনে** শিশুর ঘুম ভেঙেছে। |
| **জিজি** | দিদি (স্থানীয় বা কথ্য ভাষায়) | **জিজি** অন্য ঘরে ঘুমোচ্ছে। |
| **বেঘোরে** | বেহুঁশ বা অচেতন অবস্থায়, গভীর ঘুমে | দিদি **বেঘোরে** ঘুমোচ্ছে। |
| **টুংটাং** | এক ধরণের মৃদু আওয়াজ (পুতুলের নাচের শব্দ) | পুতুলেরা **টুংটাং** শব্দে নাচে। |
| **আজান** | ইসলাম ধর্মে নামাজের জন্য আহ্বান ধ্বনি | একদিকে **আজান** শোনা যায়। |
| **সিয়ারাম** | সীতারাম (হিন্দু ধর্মের ধ্বনি) | অন্যদিকে **সিয়ারাম** ধ্বনি শোনা যায়। |
| **আরাম** | স্বস্তি, শান্তি বোধ করা | সব ঠিকঠাক থাকায় শিশুটির মনে **আরাম**। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. শিশুটির ঘুম কীভাবে ভাঙল? ঘুম ভেঙে সে কী দেখল?
শিশুটির ঘুম **পাখিদের কূজনে** ভাঙল। ঘুম ভেঙে সে দেখল, তার **দুই পাশে বাবা ও মা** দুজনেই শুয়ে আছেন।
২. শিশুটির দিদি এবং পুতুলেরা কী করছিল?
শিশুটির দিদি (জিজি) **ওই ঘরে ঘুমভরে বেঘোরে** ঘুমোচ্ছিল, আর ঘরের **পুতুলেরা** যেন **টুংটাং** শব্দে নেচে উঠেছিল।
৩. শিশুটির মনে কখন ‘কী আরাম’ অনুভূতিটি হলো?
যখন সে দেখল **সবকিছু ঠিকঠাক** আছে—বাবা-মা পাশে, দিদি ঘুমোচ্ছে এবং বাইরে **আজান ও সিয়ারামের** মতো শান্ত ধর্মীয় ধ্বনি শোনা যাচ্ছে—তখন তার মনে **নিরাপত্তা ও স্বস্তির** অনুভূতি হয়।
৪. ছড়াটিতে সকালের কোন দুটি ধর্মীয় ধ্বনির কথা বলা হয়েছে?
ছড়াটিতে সকালের যে দুটি ধর্মীয় ধ্বনির কথা বলা হয়েছে: একপাশে **আজান** এবং অন্যপাশে **সিয়ারাম (সীতারাম)** ধ্বনি। এটি **সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির** ইঙ্গিত দেয়।
৫. এই ছড়াটি থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই?
এই ছড়াটি আমাদের শেখায় যে, **জীবনের শ্রেষ্ঠ আরাম** বা শান্তি **সম্পদ বা বিলাসিতায়** নয়, বরং **পারিবারিক নিরাপত্তা, স্নেহ এবং চারপাশের শান্ত পরিবেশে** নিহিত থাকে।
৬. শিশুটির পাশে বাবা-মা দুজনে শুয়ে থাকা কেন আরামের প্রতীক?
বাবা-মা দুজনে পাশে শুয়ে থাকা শিশুটির জন্য **নিরাপত্তা ও ভালোবাসার** প্রতীক। এই **পারিবারিক সান্নিধ্য** তাকে জাগতিক চিন্তা থেকে মুক্ত করে **গভীর স্বস্তি** ও আরাম এনে দেয়।
৭. ‘ওই ঘরে ঘুমভরে জিজি আছে বেঘোরে’— দিদির ঘুমকে ‘বেঘোরে’ বলা হয়েছে কেন?
দিদির ঘুমকে **’বেঘোরে’** বলা হয়েছে, কারণ সে **গভীর ও অচেতন** অবস্থায় ঘুমাচ্ছিল। বাইরের **পাখির ডাক বা টুংটাং শব্দে**ও তার ঘুম ভাঙেনি, যা তার গভীর ঘুমের ইঙ্গিত দেয়।
৮. কেন পুতুলেরা ‘টুংটাং নেচে ওঠে’ বলে মনে হয়েছে?
আসলে পুতুলেরা নাচেনি। **শিশুর মনের আনন্দ** এত বেশি ছিল যে, সেই আনন্দ পুতুলদের মধ্যে **আরোপ** হয়েছে। পুতুলের মৃদু শব্দ বা লেখকের মনের খুশিকে **নাচ** ও **টুংটাং** শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘আরাম’ কবিতায় শিশুটির চোখে কীভাবে পারিবারিক নিরাপত্তা ও শান্তি ফুটে উঠেছে?
কবিতাটিতে শিশুটির চোখে পারিবারিক নিরাপত্তা ও শান্তি ফুটে উঠেছে:
- **বাবা-মায়ের উপস্থিতি:** ঘুম ভেঙে সে প্রথমেই দেখল **দুই পাশে বাবা ও মা** দুজনেই শুয়ে আছেন। এই **সান্নিধ্য** তাকে মানসিক **নিরাপত্তা ও স্বস্তি** দেয়।
- **দিদির গভীর ঘুম:** অন্য ঘরে দিদির **’বেঘোরে’** ঘুমানো প্রমাণ করে যে, বাড়িতে **কোনো উদ্বেগ বা ভয়** নেই, তাই সে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছে।
- **ধর্মীয় সম্প্রীতি:** একপাশে **আজান** এবং অন্যপাশে **সিয়ারাম** ধ্বনি শোনা যাওয়া প্রমাণ করে যে, তাদের আশেপাশে **শান্তি ও সম্প্রীতি** বিরাজ করছে।
এই **নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশ** শিশুটির মনে **’আঃ! আজ কী আরাম!’**—এই চরম স্বস্তির অনুভূতি এনে দেয়।
২. ‘আরাম’ কবিতাটি ভোরের এক কর্মমুখর আহ্বান—যুক্তি সহকারে আলোচনা করো।
‘আরাম’ ছড়াটি আলস্যের বর্ণনা দিলেও, এটি আসলে **ভোরের কর্মমুখর আহ্বান**।
- **প্রকৃতির আহ্বান:** **পাখিদের কূজনে** ঘুম ভাঙা এবং **আলো ছড়িয়ে পড়া**—এগুলিই দিন শুরু হওয়ার প্রাকৃতিক সংকেত।
- **ধর্মীয় আহ্বান:** **আজান** ও **সিয়ারাম**—এই দুটি ধ্বনিই ধর্মপ্রাণ মানুষকে **দিনের কাজ ও আরাধনা** শুরুর জন্য আহ্বান জানায়।
- **বিশ্রামের সমাপ্তি:** শিশুটির **আরামের অনুভূতি** আসলে **গভীর ঘুমের সমাপ্তি** এবং **কাজ শুরুর আগে মানসিক শান্তির** ইঙ্গিত দেয়। এই আরাম হলো নতুন করে কাজ শুরুর আগে নেওয়া শক্তি।
এইভাবে ছড়াটি শান্ত পরিবেশে **সুখ ও স্বস্তিকে** চিহ্নিত করে, যা শিশুদের **উৎফুল্ল মনে দিন শুরু করার** অনুপ্রেরণা যোগায়।
৩. পুতুলেরা কেন টুংটাং নেচে ওঠে? এই পুতুল ও দিদির ঘুমের ঘটনার মধ্যে দিয়ে কীসের বৈপরীত্য ফুটে ওঠে?
পুতুলেরা নেচে ওঠে কারণ এটি **শিশুটির মনের আনন্দের** বহিঃপ্রকাশ। ঘুম ভেঙে চারপাশের শান্তি দেখে শিশুটির মন খুশি হয়েছে, সেই **সজীবতা** পুতুলদের **নাচের** মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
**বৈপরীত্য:**
- **পুতুল (সজীবতা):** পুতুলেরা **টুংটাং নেচে** উঠেছে। এটি **শিশু মনের জেগে ওঠা** ও **জীবনের স্পন্দনের** প্রতীক।
- **দিদি (নিস্তব্ধতা):** দিদি **ওই ঘরে ঘুমভরে বেঘোরে** ঘুমোচ্ছে। দিদির ঘুম হলো **নিস্তব্ধতা ও বিশ্রামের** প্রতীক।
এই বৈপরীত্যে বোঝানো হয়েছে: জগতের একাংশে **জীবন সবে শুরু হচ্ছে (নাচ)**, অন্যদিকে **বিশ্রাম** চলছে। এটি শিশুটিকে জীবনের **সহজ সামঞ্জস্য** ও **নিরাপত্তার** অনুভূতি দেয়।