বাংলা সাহিত্য (তৃতীয় শ্রেণি)
পঞ্চদশ পাঠ: নদীর তীরে একা (জীবন সর্দার) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** প্রকৃতি পড়ুয়ার দপ্তর | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** নদীর প্রতি ভালোবাসা, ঋতুভেদে নদীর রূপ ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**জীবন সর্দার (ছদ্মনাম):** তাঁর আসল নাম **সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়** (জন্ম ১৯৩৫)। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের **নদী-নালা, পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির পাঠ** নিতেন। তিনি ছদ্মনামে **’সন্দেশ’** পত্রিকায় **’প্রকৃতি পড়ুয়ার দপ্তর’** নামে ধারাবাহিক লেখা শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলি হলো—**’পাখি সব’, ‘পাখির কাহিনী’** এবং **’প্রাণী ও প্রকৃতি’**। তিনি **’গোপাল ভট্টাচার্য স্মৃতি পুরস্কার’** পেয়েছেন।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
গল্পটি লেখক **জীবন সর্দারের** নদীকে জানার এক **ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা**। তিনি নিজেকে **’প্রকৃতি-পড়ুয়া’** বলেন, যিনি নদীর তীরে শুধু বসে না থেকে, **নদীর চরিত্র ও দশা** জানার চেষ্টা করেন।
১. **বর্ষার অভিজ্ঞতা:** এক বছর বর্ষায় বৃষ্টি কম হলেও শরতের ঝমঝম বৃষ্টিতে তাঁর **প্রিয় তিন নদী** (ইছামতী, দামোদর, রূপনারাণ) ভরা ভরা হয়ে উঠেছিল। লেখক তার প্রিয় ঘাট **’খাদিনানের’** পথে পাড়ি দেন। তিনি জলের কিনার ধরে **হেঁটে যাওয়া** পছন্দ করেন। ২. **মাঝির সঙ্গে আলাপ:** **মহিষরেখা ঘাটে** তিনি মনু নামে এক মাঝির ডিঙিতে ওঠেন। মনু তাঁকে মনে করিয়ে দেয়, চৈত্র মাসে **শুকনো কাল**-এ দামোদরের রূপ কেমন ছিল, যখন তীর ধরে সবজি ফসল দেখা যেত। ৩. **নদীর চরিত্র:** মনু জানায়, দামোদরে এখন **জোয়ার-ভাটা খেলে না**, কারণ **নদীর মুখে গেট** বসানো হয়েছে। মনুর অভিজ্ঞতা লেখকের চেয়ে বেশি ছিল। ৪. **পর্যবেক্ষণ:** লেখক নদীর তীরে **পাখি, প্রজাপতি** এবং **শামুক-গেঁড়ি-গুগলির খোলস** দেখতে পান। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এবার আর কথা নয়, শুধু **এক মনে দেখা**।
এই গল্পটি ঋতুভেদে নদীর রূপের পরিবর্তন এবং প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **প্রকৃতি-পড়ুয়া** | যিনি প্রকৃতিকে চিনতে, বুঝতে, জানতে ও আপন করে নিতে ভালোবাসেন | লেখক নিজেকে **প্রকৃতি-পড়ুয়া** বলেছেন। |
| **ফুরসত** | অবসর, সুযোগ | লেখক **ফুরসত** পেলেই নদীর তীরে যান। |
| **জোয়ার-ভাটা** | নদীর জল চাঁদের অবস্থানের জন্য বেড়ে গেলে জোয়ার আর কমলে ভাটা | দামোদরে এখন **জোয়ার-ভাটা** খেলে না। |
| **শুকনো কাল** | শুকনো সময়, খরা বা গ্রীষ্মকাল | চৈত্র মাসে নদীর রূপ ছিল **শুকনো কাল**-এর মতো। |
| **ডিঙি** | ছোটো নৌকা | লেখক **মহিষরেখা ঘাটে** মনুর **ডিঙি** পেয়েছিলেন। |
| **চড়া** | নদীর মাঝের উঁচু বালুকাময় অংশ বা তীর | লেখক দামোদরের **চড়ায় চখা** দেখেছেন। |
| **চখা** | এক ধরণের পরিযায়ী হাঁস (Chakrab) | লেখক দামোদরের চড়ায় **চখা** দেখেছিলেন। |
| **সরাল** | বকের মতো এক ধরনের পাখি (Brahmini Duck) | মনু বলেছিল, কার্তিক মাসেই **সরাল** দেখা যায়। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. লেখক নিজেকে ‘প্রকৃতি-পড়ুয়া’ বলেছেন কেন?
লেখক নিজেকে **’প্রকৃতি-পড়ুয়া’** বলেছেন, কারণ তিনি নদীর তীরে শুধু বসে থাকেন না, বরং **নদী কেমন নদী**, তার **চরিত্র ও দশা** জানার জন্য **পর্যবেক্ষণ** করেন এবং সেই জ্ঞান অর্জন করতে ভালোবাসেন।
২. ঝমঝম বৃষ্টিতে নদীরা কী করেছিল?
শরতের পর পর কদিন **ঝমঝম বৃষ্টি** হতেই নদীরা **রং পালটে** নিল এবং **ভরা ভরা** হয়ে উঠেছিল।
৩. লেখক কেন হেঁটে যাওয়া পছন্দ করেন?
লেখক **নদীর ধারে জলের কিনার ধরে** হেঁটে যাওয়া পছন্দ করেন। কারণ এতে তিনি নদীর **পার্শ্ববর্তী পরিবেশ, মাটি ও প্রাকৃতিক দৃশ্যকে** নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
৪. চৈত্র মাসে দামোদরের তীরে কেমন পরিবেশ ছিল?
মনুর কথা অনুযায়ী, চৈত্র মাসে ছিল **’শুকনো কাল’**। তখন দামোদরের **অন্য রূপ** ছিল এবং নদীর তীর ধরে **সবজি ফসল** দেখা যেত।
৫. বর্তমানে দামোদরে জোয়ার-ভাটা খেলে না কেন?
মাঝির কথা অনুযায়ী, দামোদরের **মুখে গেট বসানো** হয়েছে। এই গেট দিয়ে **গঙ্গার জল আসা-যাওয়া ঠিক হয়**। এই নিয়ন্ত্রণের কারণে দামোদরে এখন জোয়ার-ভাটা খেলে না।
৬. দামোদরে ভাটা লেগেই থাকে কেন?
দামোদরের **উপরে বাঁধের জল ছাড়লেই** হৈ হৈ করে জল নেমে আসে। এই কারণে নদীতে **ভাটা লেগেই থাকে** এবং জোয়ারের জল আর কেরামতি দেখাতে পারে না।
৭. দামোদরের চড়ায় লেখক কোন কোন পাখি দেখেছিলেন?
লেখক দামোদরের চড়ায় **চখা, কাদাখোঁচা** এবং **মেছো বক** দেখেছিলেন। এই পাখিগুলি সাধারণত নদীর চরে বা জলাভূমিতে থাকে।
৮. লেখক মনুর ডিঙিতে বসে কী সিদ্ধান্ত নিলেন?
লেখক মনুর ডিঙিতে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, **এখন আর কথা নয়, শুধু এক মনে দেখা**। তিনি নদীর তীর, গাছপালা, মাটির রং এবং পলি জমে থাকা স্তর—সবকিছু এক মনে পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘নদীর তীরে একা’ গল্পে লেখক কীভাবে ঋতুভেদে নদীর রূপকে পর্যবেক্ষণ করেছেন?
লেখক ঋতুভেদে নদীর রূপকে অত্যন্ত মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন:
- **বর্ষা/শরৎ:** বর্ষার শেষে শরতের **ঝমঝম বৃষ্টিতে** নদীরা **ভরা ভরা** হয় এবং **’রং পালটে’** নেয়। এটি নদীর **সজীব ও চঞ্চল** রূপ।
- **গ্রীষ্ম (শুকনো কাল):** **চৈত্র মাসে ‘শুকনো কাল’**-এ দামোদরের অন্য রূপ দেখা যায়। তখন নদীর জল কম থাকে এবং তীর ধরে **সবজি ফসল** দেখা যায়।
লেখক মনে করেন, **একই নদীকে ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে** দেখলে তার **নানান রকম দশা** শেখা যায়। এই পর্যবেক্ষণ লেখকের **গভীর প্রকৃতি প্রেমের** পরিচয় বহন করে।
২. লেখক নিজেকে কেন ‘প্রকৃতি-পড়ুয়া’ বলেছেন? প্রকৃতি-পড়ুয়া হিসেবে তাঁর কাজ কী?
লেখক নিজেকে **’প্রকৃতি-পড়ুয়া’** বলেছেন, কারণ:
- **পর্যবেক্ষণ:** তিনি শুধু নদীর তীরে বসে থাকেন না, বরং **নদী কেমন নদী**, তার **দশা ও চরিত্র** জানার চেষ্টা করেন। তিনি খুঁটিয়ে **গাছপালা, মাটির রং, পলি জমার স্তর, পাখি ও প্রজাপতির চলাচল** দেখেন।
- **শিক্ষণ:** তিনি মনে করেন, প্রকৃতির কাছে **শিখে শেখার** আনন্দই আসল। তাই তিনি এক মনে নদীর রূপ দেখেন।
- **নিয়মিত চর্চা:** তিনি **ফুরসত পেলেই** নদীর তীরে যান এবং একই নদীকে **ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে** পর্যবেক্ষণ করেন—যা প্রকৃতির প্রতি তাঁর **গভীর অনুরাগ ও নিয়মিত চর্চার** ফল।
৩. মাঝি মনুর চরিত্রের মাধ্যমে লেখকের কোন উদ্দেশ্য সফল হয়েছে?
মাঝি মনুর চরিত্রের মাধ্যমে লেখকের নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যগুলি সফল হয়েছে:
- **স্থানীয় জ্ঞানের উৎস:** মনু সেই অঞ্চলের **নদী ও প্রকৃতির** সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সে লেখককে **দামোদরের শুকনো কালের রূপ, জোয়ার-ভাটা না খেলার কারণ** এবং **পাখিদের আগমন-নির্গমন** সম্পর্কে তথ্য দেয়।
- **তুলনা ও বৈপরীত্য:** মনুর সরল কথাগুলো লেখকের **তাত্ত্বিক জ্ঞানের** সঙ্গে মিশে গিয়ে নদীর **বাস্তব পরিস্থিতিকে** আরও স্পষ্ট করেছে। মনুর অভিজ্ঞতা লেখকের চেয়ে বেশি, যা জ্ঞান অর্জনের জন্য **সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর** গুরুত্ব বোঝায়।
- **যাত্রার সঙ্গী:** মনু কেবল তথ্যদাতা নয়, সে লেখকের **নদী-পর্যবেক্ষণের** সঙ্গী এবং ভ্রমণের **সহায়ক**।
মাঝি মনু লেখকের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ যাত্রার **এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ**।