বাংলা সাহিত্য (তৃতীয় শ্রেণি)
ত্রয়োদশ পাঠ: হিংসুটি (সুকুমার রায়) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত গল্প | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** ঈর্ষা বা হিংসার ক্ষতিকর প্রভাব এবং তার হাস্যকর পরিণতি।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩):** তিনি ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের এক কিংবদন্তী। বিখ্যাত সাহিত্যিক **উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছেলে** এবং **সত্যজিৎ রায়ের বাবা**। তাঁর লেখাগুলি **ননসেন্স রাইম (Nonsense Rhyme)** বা উদ্ভট রচনার জন্য বিখ্যাত। তাঁর রচনায় **অসঙ্গতিপূর্ণ চিত্রকল্প** এবং **হাস্যরস** প্রাধান্য পায়। তাঁর বিখ্যাত রচনাগুলি হলো—**’আবোল তাবোল’, ‘হ-য-ব-র-ল’, ‘পাগলা দাশু’** এবং **’ঝালাপালা’**।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
গল্পটি **’হিংসুটি’** নামে এক **বেজায় হিংসুটে ও বেয়াড়া** মেয়ের কথা। সে সবসময় তার দিদির ওপর রাগ করত এবং হিংসা করত।
১. **হিংসার কারণ:** দিদি **খেলাধুলা, লেখাপড়া**—সব কাজই ভালো পারত এবং **মিষ্টি স্বভাবের** ছিল। দিদির এসব গুণের জন্যই হিংসুটি আরও বেশি হিংসা করত। ২. **অসুস্থতা ও মিথ্যা:** দিদি একবার অসুখে পড়লে হিংসুটি খুশি হয়েছিল। দিদি সুস্থ হওয়ার ভান করলে সে আরও রেগে যায়। দিদির অসুখের সময় তার **’মিষ্টি স্বভাব’** দেখেও হিংসুটির দিদিকে **শারীরিক শাস্তি** দিতে ইচ্ছে করত। ৩. **অপমান ও শাস্তি:** দিদি একদিন হিংসুটিকে একটি **মিষ্টি পুতুল** উপহার দেয়। কিন্তু হিংসুটি ভাবে—পুতুলটা দিদির, তাই সে এটিকে ছুঁয়ে দেখতেও ঘৃণা করে। পুতুলটি দিদির কাছে ফিরে গেলে দিদি আর কোনো কথা না বলে পুতুলটিকে **মন ভরে আদর** করে। দিদির এই আচরণে হিংসুটি **অপমানিত** বোধ করে।
গল্পের শেষে দিদি যখন তার সমস্ত পুতুলকে **জল, আলো ও মুক্ত হাওয়ায়** ফেলে দেয়, তখন হিংসুটি ভাবে দিদি **পাগল** হয়ে গেছে। কিন্তু দিদি তাকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল যে, **ঈর্ষা করলে বা পুতুলকে ভালোবাসলে কেউ পুতুলকে নিজের করে পায় না**। এই ঘটনার পর হিংসুটি প্রতিজ্ঞা করে: **’আমি আর কখনো নিজের কাজে ফাঁকি দেব না আর হিংসুটি হয়ে থাকব না’**।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **হিংসুটি** | ঈর্ষাপরায়ণ, যে সর্বদা হিংসা করে | গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র **হিংসুটি** মেয়েটি। |
| **বেয়াড়া** | অবাধ্য, বদমাশ | হিংসুটি ছিল বেজায় হিংসুটে আর **বেয়াড়া**। |
| **বেজায়** | অতিরিক্ত, খুব বেশি | হিংসুটি ছিল **বেজায়** হিংসুটে। |
| **টুংটাং** | পুতুলের নাচের শব্দ, মৃদু বাজনার শব্দ | পুতুলেরা নেচে উঠলে **টুংটাং** শব্দ হয়। |
| **মুচকি হাসি** | মৃদু হাসি | দিদির **মুচকি হাসি** দেখে হিংসুটির রাগ হতো। |
| **খুশকি** | মাথার ত্বকের রোগবিশেষ (Dandruff) | হিংসুটি দিদির মাথায় **খুশকি** খুঁজত। |
| **গাল ফুলিয়ে** | রাগ করে, মুখ গোমড়া করে | হিংসুটি রাগ করে **গাল ফুলিয়ে** থাকত। |
| **ফ্যালফ্যাল** | বিমূঢ় বা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকা | দিদির কাণ্ড দেখে হিংসুটি **ফ্যালফ্যাল** করে তাকিয়েছিল। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. দিদি কেমন মেয়ে ছিল? দিদিকে দেখে হিংসুটির কেমন লাগত?
দিদি **খেলাধুলা, লেখাপড়া**—সব কাজই ভালো পারত এবং তার **স্বভাব ছিল মিষ্টি**। দিদির এসব গুণের জন্যই হিংসুটির তাকে দেখলেই **রাগ হতো** এবং **হিংসা** করত।
২. দিদি যখন অসুখে পড়ল, তখন হিংসুটি কী করেছিল?
দিদি যখন অসুখে পড়ল, তখন হিংসুটি **খুশি হয়েছিল**। সে মনে মনে ভেবেছিল, দিদি অসুস্থ হলে সে **সারা দিন ধরে আরাম** করতে পারবে।
৩. হিংসুটি কেন পুতুলটিকে ছুঁয়ে দেখতেও ঘৃণা করত?
দিদি পুতুলটিকে উপহার হিসেবে দেওয়ায় হিংসুটি সেটিকে ছুঁয়ে দেখতে ঘৃণা করত। কারণ তার মতে, **পুতুলটি দিদির ছিল**, আর **দিদির কোনো জিনিসকে সে ভালোবাসতে পারত না**।
৪. দিদি তার সব পুতুলদের কী করেছিল? হিংসুটি তা দেখে কী ভাবল?
দিদি তার সমস্ত পুতুলদের **জল, আলো ও মুক্ত হাওয়ায়** ফেলে দিয়েছিল। হিংসুটি এই কাণ্ড দেখে প্রথমে ভাবল, দিদি বোধহয় **পাগল** হয়ে গেছে।
৫. দিদির কাণ্ড দেখে হিংসুটি শেষ পর্যন্ত কী প্রতিজ্ঞা করল?
দিদির কাণ্ড দেখে এবং দিদির শিক্ষা বুঝতে পেরে হিংসুটি প্রতিজ্ঞা করল—**সে আর কখনও নিজের কাজে ফাঁকি দেবে না** এবং **হিংসুটি হয়ে থাকবে না**।
৬. দিদির কোন গুণটি হিংসুটির সবচেয়ে বেশি অপছন্দ ছিল?
দিদি **খেলাধুলা, লেখাপড়া—সব কাজই ভালো পারত** এবং তার **মিষ্টি স্বভাব** ছিল। কিন্তু তার সব গুণের মধ্যে **মিষ্টি স্বভাব ও হাসি** দেখলেই হিংসুটির **বেজায় রাগ** হতো।
৭. দিদি হিংসুটিকে কোন বিষয়ে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল?
দিদি হিংসুটিকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল যে, **পুতুলকে জোর করে নিজের করে রাখা যায় না** বা **ঈর্ষা করলে কোনো আনন্দ** পাওয়া যায় না। **ভালোবাসা ও সহজ মনোভাব** দ্বারাই কেবল সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়।
৮. হিংসুটি কেন দিদিকে শারিরীক শাস্তি দিতে চেয়েছিল?
দিদি অসুস্থ থাকলেও তার **মিষ্টি স্বভাব** বজায় ছিল। দিদির এই মিষ্টি স্বভাব ও হাসি দেখে হিংসুটির এত রাগ হতো যে সে মনে মনে দিদিকে **শারীরিক শাস্তি** দিতে চেয়েছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. দিদি কীভাবে তার আচরণ দিয়ে হিংসুটিকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিল?
দিদি বুদ্ধিমত্তা ও স্নেহের মাধ্যমে হিংসুটিকে শিক্ষা দিয়েছিল:
- **সহজ উপহার:** দিদি একটি **মিষ্টি পুতুল** হিংসুটিকে উপহার দেয়, কিন্তু হিংসুটির ঘৃণা দেখে সে কোনো **রাগ দেখায়নি**।
- **শান্তভাবে গ্রহণ:** যখন হিংসুটি পুতুলটি ফিরিয়ে দেয়, দিদি তখন **কোনো কঠিন কথা না বলে** বরং পুতুলটিকে মন ভরে **আদর** করে।
- **আত্মত্যাগ:** দিদি তার সমস্ত পুতুলকে **জল, আলো ও হাওয়ায়** ফেলে দেয়। এই **গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ত্যাগের** মাধ্যমে সে বোঝায় যে, পুতুলকে ধরে রাখলে বা হিংসা করলে কোনো লাভ নেই।
দিদির **স্নেহময় ও নিঃস্বার্থ** আচরণ দেখে হিংসুটি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে যে, তার **হিংসা ও আলস্য** ভুল ছিল।
২. ‘হিংসুটি’ গল্পে সুকুমার রায় কোন নীতিশিক্ষা দিতে চেয়েছেন? তোমার যুক্তিসহ লেখো।
সুকুমার রায় এই গল্পের মাধ্যমে শিশুদের দুটি প্রধান নীতিশিক্ষা দিতে চেয়েছেন:
- **হিংসার ক্ষতিকর প্রভাব:** হিংসুটি মেয়েটি দিদির **ভালো কাজেও** হিংসা করত। এই হিংসার কারণে সে দিদির কাছে পুতুল উপহার পেয়েও **আনন্দ** পায়নি। হিংসা কেবল **মনকে বিষিয়ে দেয়** এবং কোনো ভালো ফল দেয় না।
- **আলস্য ও কর্তব্যের শিক্ষা:** হিংসুটি **নিজের কাজে ফাঁকি** দিত। দিদির নিঃস্বার্থ ত্যাগ দেখে সে বুঝতে পারে যে, পুতুল বা সম্পদকে **নিজের করে পেতে হলে** ভালোবাসা ও চেষ্টা করতে হয়, আলস্য ও হিংসা করে না। তাই সে **ফাঁকি না দেওয়ার** প্রতিজ্ঞা করে।
সুতরাং, গল্পের নীতিশিক্ষা হলো: **হিংসা ও আলস্য ত্যাগ করো, ভালোবাসো ও কাজ করো**—তবেই জীবনে সুখী হওয়া সম্ভব।
৩. হিংসুটি কেন দিদির ভালো কাজ ও মিষ্টি স্বভাবকে সহ্য করতে পারত না?
হিংসুটি দিদির ভালো কাজ ও মিষ্টি স্বভাবকে সহ্য করতে পারত না, কারণ:
- **অহংকারের আঘাত:** হিংসুটি ছিল **বেয়াড়া ও আলস্যপূর্ণ**। দিদি সব কাজ ভালো পারত বলে হিংসুটির **অহংকারে আঘাত** লাগত। দিদির সাফল্য তার নিজের ব্যর্থতা মনে হতো।
- **বৈপরীত্য:** দিদির **মিষ্টি স্বভাব ও হাসি** ছিল হিংসুটির **রাগ ও গোমড়া মুখের** সম্পূর্ণ বিপরীত। এই বৈপরীত্য তাকে আরও বেশি ঈর্ষান্বিত করত।
- **দোষ খোঁজ:** হিংসার কারণে সে দিদির **ভালো দিকের বদলে শুধু ভুল** খুঁজতে থাকত (যেমন মাথায় খুশকি খোঁজা)। দিদির মিষ্টি স্বভাব দেখে তার মনে হতো দিদি যেন তাকে **উপহাস** করছে।
হিংসার এই চক্র তাকে দিদির ভালো গুণগুলো থেকে **শিক্ষা নিতে বাধা** দিত এবং তাকে ক্রমশ একা করে দিচ্ছিল।