বাংলা সাহিত্য (তৃতীয় শ্রেণি)
দশম পাঠ: পানতা বুড়ি (যোগীন্দ্রনাথ সরকার) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত ছড়া | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** গ্রামবাংলার সরল জীবন, নদী ও বুড়ির কষ্টের সহানুভূতি।
—১. কবি পরিচিতি (Author Information)
**যোগীন্দ্রনাথ সরকার (১৮৬৬-১৯৩৭):** তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক। তাঁর রচিত ছড়া ও কবিতাগুলি সরল, হাস্যরসাত্মক এবং শিক্ষামূলক। তাঁর **’হাসি ও খেলা’** বইটি বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় গ্রন্থ। এছাড়া তাঁর **’ছড়া ও ছবি’** এবং **’খুকুমণির ছড়া’** বইগুলিও খুব বিখ্যাত। তিনি শিশুদের জন্য **বর্ণপরিচয় ও ধারাপাতের** মতো প্রাথমিক শিক্ষামূলক বইও লিখেছিলেন।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘পানতা বুড়ি’ ছড়াটিতে **এক বুড়ি ও নদীর** কথা বলা হয়েছে। বুড়ি **পানতাভাত** খাচ্ছিল, আর **খুশির চোটে** নদীর দিকে তাকিয়ে হাসছিল। তার হাসি দেখে **নদীর জল বেড়ে** গেল। বুড়ি তখন **ভয়ে কাঁপে** আর **”নদী নদী”** বলে ডাকে। নদীকে সে অনুরোধ করে, তার **নৌকাখানি** ডুবিয়ে না দিতে।
নদী তখন বুড়িকে বলে যে, তার **মাছের কাঁটা** দিয়ে বানানো **মালাখানি** সে যদি নদীর জলে ছুঁড়ে দেয়, তবে তার নৌকা ডুববে না। বুড়ি **’কাঁটা কাঁটা’** বলে কাঁদলেও, উপায় না দেখে **মালাখানি নদীর জলে ছুঁড়ে দেয়**। নদী তখন **খুশি মনে চলে যায়**।
এই ছড়াটি গ্রামবাংলার **অন্ধবিশ্বাস, নদীর মাহাত্ম্য** এবং সরল জীবনযাত্রার ছবি তুলে ধরে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **পানতা বুড়ি** | পানতা ভাত খাওয়া বুড়ি | গল্পের প্রধান চরিত্র **পানতা বুড়ি**। |
| **পানতা** | পান্তা, আগের দিনের রান্না করা ভাত যা জলে ভিজিয়ে রাখা হয় | বুড়ি **পানতাভাত** খাচ্ছিল। |
| **খুশির চোটে** | অতিরিক্ত আনন্দের প্রভাবে | বুড়ি **খুশির চোটে** হাসছিল। |
| **কাঁপে** | থরথর করে কাঁপা | নদীর জল বাড়ায় বুড়ি **ভয়ে কাঁপে**। |
| **নৌকাখানি** | ছোট্ট নৌকা | বুড়ি অনুরোধ করে **নৌকাখানি** না ডুবিয়ে দিতে। |
| **কাঁটা** | মাছের বা অন্য কিছুর ধারালো অংশ | নদী বুড়ির **মাছের কাঁটা** দিয়ে বানানো মালা চাইল। |
| **মালাখানি** | ছোট্ট মালা | বুড়িকে **মালাখানি** নদীর জলে ছুঁড়ে দিতে হয়েছিল। |
| **ছুঁড়ে** | ফেলে দেওয়া, নিক্ষেপ করা | বুড়ি মালাখানি জলে **ছুঁড়ে** দিল। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. ‘পানতা বুড়ি’ কখন এবং কেন নদীর দিকে তাকিয়ে হাসছিল?
বুড়ি **পানতাভাত** খাচ্ছিল এবং সেই **খুশির চোটে** নদীর দিকে তাকিয়ে হাসছিল। পান্তা খেয়ে তার মন খুশি হয়েছিল।
২. বুড়ির হাসির ফল কী হয়েছিল?
বুড়ির হাসি দেখে **নদীর জল হু হু করে বেড়ে** গিয়েছিল। জল বেড়ে যাওয়ায় বুড়ির **ভয়** হয়েছিল যে তার নৌকাখানি বুঝি ডুবে যাবে।
৩. নদীতে জল বাড়ায় বুড়ি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাল?
নদীতে জল বাড়ায় বুড়ি **ভয়ে কাঁপতে** লাগল এবং **”নদী নদী”** বলে ডাকতে শুরু করল। সে নদীকে তার **নৌকাখানি না ডুবিয়ে দেওয়ার** জন্য কাকুতি-মিনতি করে অনুরোধ করল।
৪. নদী বুড়ির কাছে কী চেয়েছিল?
নদী বুড়ির কাছে তার **মাছের কাঁটা** দিয়ে বানানো **মালাখানি** চেয়েছিল। নদী বলেছিল, সেই মালা জলে ছুঁড়ে দিলে তবেই তার নৌকা ডুববে না।
৫. নদী তার চাওয়ার জিনিস পেয়ে কী করল?
নদী তার চাওয়ার জিনিস অর্থাৎ **কাঁটার মালা** নদীর জলে **ছুঁড়ে** দেওয়ায় খুশি হলো। মালা জলে ছুঁড়ে দেওয়ার পর **নদী খুশি মনে চলে গেল**।
৬. নদী কেন বুড়ির মালাখানি চেয়েছিল?
নদী মালাখানি চেয়েছিল কারণ সে বুড়িকে **ভয় দেখাতে** এবং তার **কথা শুনতে** বাধ্য করতে চেয়েছিল। এটি লোককথার একটি অংশ, যেখানে নদীকে এক শক্তিশালী **দেবতা বা অপদেবতার** মতো দেখানো হয়েছে।
৭. বুড়ি মালাখানি দিতে প্রথমে কেন দ্বিধা করেছিল?
নদী মালাখানি চাইতেই বুড়ি **’কাঁটা কাঁটা’ বলে কেঁদেছিল**। মালাটি হয়তো তার **খুব প্রিয়** ছিল, তাই সে প্রথমে সেটি দিতে দ্বিধা করেছিল, যদিও তার নৌকা বাঁচানোর জন্য তার আর কোনো উপায় ছিল না।
৮. ‘নদীর জল হু হু করে বাড়ে’— কখন নদীর জল বাড়ে?
নদীর জল বাড়ে সাধারণত **প্রবল বৃষ্টিপাত** হলে বা **পাহাড় থেকে জল নেমে এলে**। এই ছড়াতে বুড়ির **খুশির চোটে** হাসার পর নদীর জল বেড়েছিল, যা অলৌকিক ঘটনার ইঙ্গিত দেয়।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘পানতা বুড়ি’ ছড়াটিতে যে অলৌকিকতা বা রূপকথার সুর রয়েছে, তা ব্যাখ্যা করো।
এই ছড়াটির মধ্যে কয়েকটি অলৌকিক উপাদান রয়েছে:
- **কারণ ও ফলাফলের অসঙ্গতি:** বুড়ির **পানতা খেয়ে হাসার** মতো সামান্য ঘটনায় **নদীর জল হু হু করে বেড়ে** যাওয়াটা স্বাভাবিক নয়। এটি এক **অলৌকিক শক্তির** ইঙ্গিত দেয়।
- **নদীর মানবিক রূপ:** নদী এখানে কেবল একটি জলধারা নয়, এটি একটি **সচেতন প্রাণী বা দেবতা**। নদী কথা বলতে পারে, মানুষের কাছে **দাবি** জানায় এবং **খুশি বা অসন্তুষ্ট** হতে পারে।
- **অলৌকিক চাওয়া:** নদী বুড়ির কাছে **মাছের কাঁটার মালা** চেয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের চাওয়ার বাইরে। এটি **অন্ধবিশ্বাস ও জাদুকরী আবহাওয়া** তৈরি করে।
এই সমস্ত উপাদানগুলি একত্রিত হয়ে ছড়াটিতে এক **রূপকথার সুর** সৃষ্টি করেছে।
২. এই ছড়াটিতে গ্রামবাংলার সমাজ ও জীবনযাত্রার কোন চিত্র ফুটে উঠেছে?
এই ছড়াটিতে গ্রামবাংলার জীবন ও সমাজের একটি সরল চিত্র ফুটে উঠেছে:
- **খাদ্য ও জীবনযাত্রা:** বুড়ি **পানতাভাত** খাচ্ছিল, যা গ্রামবাংলার **দরিদ্র বা সাধারণ মানুষের** জনপ্রিয় খাদ্য। **মাছের কাঁটার মালা** তার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে।
- **নদীর গুরুত্ব:** নদীতে **নৌকা** থাকা এবং নদীর জল বাড়লে **ভয় পাওয়া** প্রমাণ করে, গ্রামের মানুষের জীবনে **নদী** কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নদী তাদের **জীবিকা ও যাতায়াতের** প্রধান পথ।
- **অন্ধবিশ্বাস:** নদীকে **কথা বলা বা দাবি জানানো** একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখা—এটি গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত **অন্ধবিশ্বাস ও প্রকৃতি-পূজার** দিকটি তুলে ধরে।
৩. বুড়ি কেন প্রথমে খুশি হয়েছিল, আর পরে কেন কেঁদেছিল? শেষে তার কী অনুভূতি হয়েছিল?
**প্রথমে খুশি:** বুড়ি **পানতাভাত** খাচ্ছিল এবং সেই সামান্য খাবারের **আনন্দে** (খুশির চোটে) নদীর দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
**পরে কান্না:** তার হাসির ফলে **নদীর জল হু হু করে বেড়ে** যায় এবং তার **নৌকা ডুবে যাওয়ার ভয়** তৈরি হয়। জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় এবং নদী যখন তার **প্রিয় কাঁটার মালা** চাইল, তখন বুড়ি **’কাঁটা কাঁটা’ বলে কেঁদেছিল**।
**শেষের অনুভূতি:** উপায় না দেখে মালা ছুঁড়ে দেওয়ার পর **নদী খুশি মনে চলে যায়** এবং বুড়ির **বিপদ কেটে যায়**। শেষে তার ভয় দূর হয় এবং মনে **স্বস্তি** আসে, যদিও তাকে প্রিয় মালা হারাতে হয়েছিল।