পঞ্চম পাঠ (গদ্যাংশ)
বর্ষা নেমেছে। গর্মি আর নেই। থেকে থেকে মেঘের গর্জন আর বিদ্যুতের চমকানি চলছে। শিলং পর্বতে ঝর্নার জল বেড়ে উঠল। কর্ণফুলি নদীতে বন্যা দেখা দিয়েছে। সর্ষেখেত ডুবিয়ে দিলে। দুর্গানাথের আঙিনায় জল উঠেছে। তার দর্মার বেড়া ভেঙে গেল। বেচারা গোরুগুলোর বড়ো দুর্গতি। এক-হাঁটু পাঁকে দাঁড়িয়ে আছে। চাষিদের কাজকর্ম সব বন্ধ। ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি। কর্তাবাবু বর্ষাতি পরে চলেছেন। সঙ্গে তাঁর আর্দালি তুর্কি মিঞা। গর্ত সব ভরে গিয়ে ব্যাঙের বাসা হল। পাড়ার নর্দমাগুলো জলে ছাপিয়ে গেছে।
পঞ্চম পাঠ (কবিতা)
ঐখানে মা পুকুর-পারে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হব বনবাসী, কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি ধনুক নিয়ে হাতে। আঁচলেতে খই নিয়ে তুই যেই দাঁড়াবি দ্বারে, অমনি যত বনের হরিণ আসবে সারে সারে। শিংগুলি সব আঁকা বাঁকা, গায়েতে দাগ চাকা চাকা, লুটিয়ে তারা পড়বে ছুঁয়ে পায়ের কাছে এসে। ওরা সবাই আমায় বোঝে, করবে না ভয় একটুও যে, হাত বুলিয়ে দেব গায়ে, বসবে কাছে ঘেঁষে। ফল্সাবনে গাছে গাছে ফল ধরে মেঘ ঘনিয়ে আছে, ওইখানেতে ময়ূর এসে নাচ দেখিয়ে যাবে। শালিখরা সব মিছিমিছি লাগিয়ে দেবে কিচিমিচি, কাঠবেড়ালি লেজটি তুলে হাত থেকে ধান খাবে।
পাঠের সারসংক্ষেপ
'পঞ্চম পাঠ'-এ বর্ষাকালের একটি 생생 চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের ঝলকানি এবং অবিরাম বৃষ্টির ফলে প্রকৃতি ও জনজীবনে যে পরিবর্তন আসে, তার বর্ণনা এখানে রয়েছে। নদীতে বন্যা, খেত ডুবে যাওয়া এবং মানুষের অসুবিধার কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি, একটি শিশু তার মায়ের সঙ্গে প্রকৃতির কোলে সহজ সরল জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখছে, যেখানে সে বনের পশুপাখিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নির্ভয়ে থাকবে। এই পাঠে বর্ষার রুদ্র রূপ এবং শিশুর কোমল কল্পনা—দুই-ই একীভূত হয়েছে।
লেখক পরিচিতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ছিলেন একজন বাঙালি কবি, লেখক, সুরকার, দার্শনিক এবং চিত্রশিল্পী। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীত এবং ভারতীয় শিল্পে আধুনিকতার প্রবর্তন করেন। তাঁর "গীতাঞ্জলি" কাব্যের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই পাঠটি তাঁর "সহজ পাঠ" বই থেকে নেওয়া হয়েছে, যা শিশুদের সহজ ও আনন্দদায়কভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
শব্দার্থ
- গর্মি: গরম, উষ্ণতা।
- বন্যা: অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে নদীর জল বেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করা।
- দর্মা: বাঁশের চাঁচ দিয়ে তৈরি বেড়া বা চাঁটাই।
- দুর্গতি: দুর্দশা, কষ্ট।
- বর্ষাতি: বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ব্যবহৃত জলরোধী পোশাক।
- আর্দালি: অফিসের বা কোনো পদস্থ ব্যক্তির পিয়ন বা সহায়ক।
- বনবাসী: বনে বাস করে যে।
- কুঁড়ে: ছোট কুটির, পর্ণকুটির।
১. সঠিক বিকল্পটি বেছে নাও
ক) কোন নদীতে বন্যা দেখা দিয়েছে? i) গঙ্গা ii) কর্ণফুলি iii) তিস্তা
উত্তর: ii) কর্ণফুলি
খ) কবিতায় শিশুটি কী দিয়ে পাহারা দেবে? i) লাঠি ii) বন্দুক iii) ধনুক
উত্তর: iii) ধনুক
২. বাক্যগুলি সম্পূর্ণ করো
ক) তার দর্মার _________ ভেঙে গেল।
উত্তর: বেড়া
খ) _________ লেজটি তুলে হাত থেকে ধান খাবে।
উত্তর: কাঠবেড়ালি
৩. প্রশ্নগুলির উত্তর দাও
ক) বর্ষার কারণে চাষিদের কী অবস্থা হয়েছে?
উত্তর: বর্ষার কারণে চাষিদের কাজকর্ম সব বন্ধ হয়ে গেছে এবং তাদের গোরুগুলো এক-হাঁটু পাঁকে দাঁড়িয়ে খুব কষ্টে আছে।
খ) কবিতায় শিশুটি কার সাথে বনবাসী হতে চায়?
উত্তর: কবিতায় শিশুটি তার মায়ের সাথে বনবাসী হতে চায়।
৪. ব্যাকরণ (ক্রিয়াপদ চিহ্নিত করো)
পাঠের গদ্যাংশ থেকে পাঁচটি ক্রিয়াপদ (কাজ করা বোঝায় এমন শব্দ) খুঁজে বের করো।
উত্তর: উদাহরণ: নেমেছে, চলছে, বেড়ে উঠল, দিয়েছে, ডুবিয়ে দিলে, ভেঙে গেল, দাঁড়িয়ে আছে, চলেছেন।
৫. পাঠ নিয়ে কথোপকথন
রিমা: কী বৃষ্টি নেমেছে আজ! ঠিক 'পঞ্চম পাঠ'-এর মতো।
সুজয়: হ্যাঁ, ঠিক তাই। দুর্গানাথের বাড়ির মতো আমাদের উঠোনেও জল জমে গেছে।
রিমা: কিন্তু পাঠের কবিতাটা আমার খুব ভালো লাগে। মা আর ছেলে মিলে বনে থাকবে, হরিণ আসবে, ময়ূর নাচবে—কী সুন্দর कल्पना!
সুজয়: আমারও! মনে হয়, আমিও যদি অমন করে ধনুক হাতে পাহারা দিতে পারতাম!
পাঠের কুইজ
"পঞ্চম পাঠ" সম্পর্কে তোমার জ্ঞান পরীক্ষা করো। তোমাকে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শুভকামনা!
প্রশ্ন ১/১০
স্কোর: ০
প্রশ্ন এখানে আসবে।
কুইজ সম্পন্ন!
আপনার চূড়ান্ত স্কোর হলো:
০%