শিক্ষামূলক পাতা: দ্বাদশ পাঠ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দ্বিতীয় শ্রেণি

সহজ পাঠ - দ্বাদশ পাঠ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সহজ পাঠ' বইয়ের উপর একটি ইন্টারেক্টিভ পাঠ

দ্বাদশ পাঠ (গদ্যাংশ)

গুপ্তিপাড়ার বিশ্বম্ভর-বাবু পাল্কি চড়ে চলেছেন সপ্তগ্রাম। ফাল্গুন মাস। কিন্তু এখনো খুব ঠান্ডা। কিছু আগে প্রায় সপ্তাহ ধ'রে বৃষ্টি হয়ে গেছে। বিশ্বম্ভর-বাবুর গায়ে এক মোটা কম্বল। পাল্কির সঙ্গে চলেছে তার শম্ভু চাকর, হাতে এক লম্বা লাঠি। পাল্কির ছাদে ওষুধের বাক্স, দড়ি দিয়ে বাঁধা। শম্ভুর গায়ে অদ্ভুত জোর। একবার কুম্ভীরার জঙ্গলে তাকে ভল্লুকে ধরেছিল। সঙ্গে বন্দুক ছিল না। শুদ্ধ কেবল লাঠি নিয়ে ভল্লুকের সঙ্গে তার যুদ্ধ হল। শম্ভুর হাতের লাঠি খেয়ে ভল্লুকের মেরুদণ্ড গেল ভেঙে। তার আর উত্থানশক্তি রইল না। আর একবার শম্ভু বিশ্বম্ভর-বাবুর সঙ্গে গিয়েছিল স্বর্ণগঞ্জে। সেখানে পদ্মানদীর চরে রান্না চড়াতে হবে। তখন গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্ন। পদ্মার ধারে ছোটো ছোটো ঝাউগাছের জঙ্গল। উনান ধরানো চাই। দা দিয়ে শম্ভু ঝাউডাল কেটে আঁটি বাঁধল। অসহ্য রৌদ্র। বড়ো তৃষ্ণা পেয়েছে। নদীতে শম্ভু জল খেতে গেল। এমন সময়ে দেখলে, একটা বাছুরকে ধরেছে কুমিরে। শম্ভু এক লম্ফে জলে প'ড়ে কুমিরের পিঠে চ'ড়ে বসল। দা দিয়ে তার গলায় পোঁচ দিতে লাগল। জল লাল হয়ে উঠল রক্তে। কুমির যন্ত্রণায় বাছুরকে দিল ছেড়ে। শম্ভু সাঁতার দিয়ে ডাঙায় উঠে এল। বিশ্বম্ভর-বাবু ডাক্তার। রোগী দেখতে চলেছেন বহু দূরে। সেখানে ইস্টিমার-ঘাটের ইস্টেশন-মাস্টার মধু বিশ্বাস। তাঁর ছোটো ছেলের অম্লশূল, বড়ো কষ্ট পাচ্ছে। বিষ্ণুপুরের পশ্চিম ধারের মাঠ প্রকাণ্ড। সেখানে যখন পাল্কি এল তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রাখাল গোরু নিয়ে চলেছে গোষ্ঠে ফিরে। বিশ্বম্ভর-বাবু তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, "ওহে বাপু, সপ্তগ্রাম কত দূরে বলতে পার?" রাখাল বললে, "আজ্ঞে, সে তো সাত ক্রোশ হবে। আজ সেখানে যাবেন না। পথে ভীষ্মহাটের মাঠ, তার কাছে শ্মশান। সেখানে ডাকাতের ভয়।” ডাক্তার বললেন, "বাবা, রোগী কষ্ট পাচ্ছে, আমাকে যেতেই হবে।” তিল্পনি খালের ধারে যখন পালকি এল রাত্রি তখন দশটা। বাঁধন আলগা হয়ে পালকির ছাদ থেকে ডাক্তারের বাক্সটা গেল প'ড়ে। ক্যাস্টর অয়েলের শিশি ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেল। বাক্সটা তো ফের শক্ত ক'রে বাঁধলে। কিন্তু আবার বিপদ। খাল পেরিয়ে আন্দাজ দু ক্রোশ পথ গেছে, এমন সময় মড় মড় ক'রে ডান্ডা গেল ভেঙে, পাল্কিটা পড়ল মাটিতে। পাল্কি হালকা কাঠে তৈরি; বিশ্বম্ভর-বাবুর দেহটি স্থূল। আর উপায় নেই, এইখানেই রাত্রি কাটাতে হবে। ডাক্তার-বাবু ঘাসের উপর কম্বল পাতলেন, লণ্ঠনটি রাখলেন কাছে। শম্ভুকে নিয়ে গল্প করতে লাগলেন। এমন সময়ে বেহারাদের সর্দার বুন্ধু এসে বললে, "ওই-যে কারা আসছে, ওরা ডাকাত সন্দেহ নেই।” বিশ্বম্ভর-বাবু বললেন, "ভয় কী, তোরা তো সবাই আছিস।” বুন্ধু বললে, "বন্ধু পালিয়েছে, পল্লুকেও দেখছিনে। বক্সি লুকিয়েছে ওই ঝোপের মধ্যে। ভয়ে বিষুর হাত-পা আড়ষ্ট।” শুনে ডাক্তার তো ভয়ে কম্পিত। ডাকলেন, "শম্ভু।” শম্ভু বললে, “আজ্ঞে।” ডাক্তার বললেন, “এখন উপায় কী?” শম্ভু বললে, "ভয় নেই, আমি আছি।” ডাক্তার বললেন, “ওরা যে পাঁচজন।” শম্ভু বললে, "আমি যে শম্ভু।” এই ব'লে উঠে দাঁড়িয়ে এক লম্ফ দিলে, গর্জন করে বললে, “খবর্দার।” ডাকাতেরা অট্টহাস্য ক'রে এগিয়ে আসতে লাগল। তখন শম্ভু পালকির সেই ভাঙা ডান্ডাখানা তুলে নিয়ে ওদের দিকে ছুড়ে মারলে। তারি এক ঘায়ে তিনজন একসঙ্গে পড়ে গেল। তার পরে শম্ভু লাঠি ঘুরিয়ে যেই ওদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাকি দুজনে দিল দৌড়। তখন ডাক্তার-বাবু ডাকলেন, "শম্ভু।” শম্ভু বললে, "আজ্ঞে।” বিশ্বম্ভর-বাবু বললেন, “এইবার বাক্সটা বের করো।” শম্ভু বললে, "কেন, বাক্স নিয়ে কী হবে?” ডাক্তার বললেন, "ওই তিনটে লোকের ডাক্তারি করা চাই। ব্যান্ডেজ বাঁধতে হবে।”

দ্বাদশ পাঠ (কবিতা)

স্টিমার আসিছে ঘাটে, প'ড়ে আসে বেলা- পূজার ছুটির দল, লোকজন মেলা এল দূর দেশ হতে; বৎসরের পরে ফিরে আসে যে যাহার আপনার ঘরে। জাহাজের ছাদে ভিড়; নানা লোকে নানা মাদুরে কম্বলে লেপে পেতেছে বিছানা ঠেসাঠেসি ক'রে। তারি মাঝে হরেরাম মাথা নেড়ে বাজাইছে হারমোনিয়াম। বোঝা আছে কত শত, বাক্স কত রূপ, টিন বেত চামড়ার পুঁটুলির স্তূপ, থলি ঝুলি ক্যাম্বিসের, ডালা ঝুড়ি ধামা সবজিতে ভরা। গায়ে রেশমের জামা, কোমরে চাদর বাঁধা, চণ্ডী অবিনাশ কলিকাতা হতে আসে, বঙ্কু শ্যামদাস অম্বিকা অক্ষয়; নতুন চিনের জুতা করে মসস্মস্, মেরে কনুইয়ের গুঁতা ভিড় ঠেলে আগে চলে; হাতে বাঁধা ঘড়ি চোখেতে চশমা কারো, সরু এক ছড়ি সবেগে দুলায়। ঘন ঘন ডাক ছাড়ে স্টিমারের বাঁশি; কে পড়ে কাহার ঘাড়ে। সবাই সবার আগে যেতে চায় চ'লে- ঠেলাঠেলি, বকাবকি। শিশু মার কোলে চিৎকার-স্বরে কাঁদে। গড় গড় ক'রে নোঙর ডুবিল জলে; শিকলের ডোরে জাহাজ পড়িল বাঁধা; সিঁড়ি গেল নেমে, এঞ্জিনের ধন্ধকি সব গেল থেমে। "কুলি কুলি” ডাক পড়ে; ডাঙা হতে মুটে দুড়দাড় ক'রে এল দলে দলে ছুটে।

পাঠের সারসংক্ষেপ

'দ্বাদশ পাঠ'-এর গদ্যাংশে বিশ্বম্ভর-বাবু নামে এক ডাক্তারের যাত্রাপথের বর্ণনা রয়েছে। তাঁর সঙ্গী साहসী চাকর শম্ভু, যে ভল্লুক ও কুমিরের সাথে লড়াই করে এবং ডাকাতদের তাড়িয়ে দেয়। ডাক্তারবাবু বিপদে পড়লেও মানবিকতা হারান না এবং আহত ডাকাতদের চিকিৎসা করতে চান। কবিতাংশে পূজার ছুটিতে স্টিমারে করে মানুষের ঘরে ফেরার আনন্দ ও ব্যস্ততার ছবি ফুটে উঠেছে, যা উৎসবের মেজাজকে তুলে ধরে।

Rabindranath Tagore

লেখক পরিচিতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ছিলেন একজন বাঙালি কবি, লেখক, সুরকার, দার্শনিক এবং চিত্রশিল্পী। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীত এবং ভারতীয় শিল্পে আধুনিকতার প্রবর্তন করেন। তাঁর "গীতাঞ্জলি" কাব্যের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই পাঠটি তাঁর "সহজ পাঠ" বই থেকে নেওয়া হয়েছে, যা শিশুদের সহজ ও আনন্দদায়কভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

শব্দার্থ

  • পাল্কি: মানুষে বয়ে নিয়ে যাওয়ার যানবাহন।
  • ভল্লুক: ভালুক।
  • মেরুদণ্ড: শিরদাঁড়া।
  • অম্লশূল: পেটের এক ধরনের রোগ বা ব্যথা।
  • স্থূল: মোটা।
  • কম্পিত: যা কাঁপছে।
  • শুশ্রুষা: সেবা।
  • স্টিমার: বাষ্পচালিত জাহাজ বা নৌকা।
  • নোঙর: জাহাজের লোহার অঙ্কুশ যা দিয়ে জাহাজকে স্থির রাখা হয়।
১. সঠিক বিকল্পটি বেছে নাও

ক) বিশ্বম্ভর-বাবু পেশায় কী ছিলেন? i) শিক্ষক ii) ডাক্তার iii) ব্যবসায়ী

উত্তর: ii) ডাক্তার


খ) কবিতায় মানুষেরা কোন ছুটিতে বাড়ি ফিরছিল? i) গরমের ছুটিতে ii) বড়দিনের ছুটিতে iii) পূজার ছুটিতে

উত্তর: iii) পূজার ছুটিতে

২. বাক্যগুলি সম্পূর্ণ করো

ক) শম্ভুর হাতের লাঠি খেয়ে ভল্লুকের _________ গেল ভেঙে।

উত্তর: মেরুদণ্ড


খ) গড় গড় ক'রে _________ ডুবিল জলে।

উত্তর: নোঙর

৩. প্রশ্নগুলির উত্তর দাও

ক) শম্ভু কীভাবে ডাকাতদের তাড়িয়ে দিয়েছিল?

উত্তর: শম্ভু পালকির ভাঙা ডান্ডা ছুঁড়ে মেরে এবং লাঠি ঘুরিয়ে ডাকাতদের তাড়িয়ে দিয়েছিল।


খ) ডাক্তারবাবু আহত ডাকাতদের জন্য কী করতে চেয়েছিলেন?

উত্তর: ডাক্তারবাবু আহত ডাকাতদের ডাক্তারি করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতে চেয়েছিলেন।

৪. ব্যাকরণ (বিশেষণ পদ খুঁজে বের করো)

পাঠের গদ্যাংশ থেকে পাঁচটি বিশেষণ পদ (যে শব্দ অন্য পদের গুণ, অবস্থা বোঝায়) খুঁজে বের করো।

উত্তর: মোটা (কম্বল), লম্বা (লাঠি), অদ্ভুত (জোর), অসহ্য (রৌদ্র), স্থূল (দেহ)।

৫. পাঠ নিয়ে কথোপকথন

ডাক্তার: শম্ভু, ওরা যে পাঁচজন ডাকাত! এখন উপায় কী?

শম্ভু: ভয় নেই বাবু, আমি আছি। আমি যে শম্ভু!

ডাক্তার: কিন্তু তুই একা কী করবি?

শম্ভু: (গর্জন করে) খবর্দার! (ডান্ডা ছুঁড়ে মেরে) দেখুন বাবু, বাকি দুজন কেমন দৌড় দিল!

ডাক্তার: শাবাশ! এইবার আমার বাক্সটা বের কর। ওই লোকগুলোর চিকিৎসা করতে হবে।

পাঠের কুইজ

"দ্বাদশ পাঠ" সম্পর্কে তোমার জ্ঞান পরীক্ষা করো। তোমাকে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শুভকামনা!

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Free WBBSE Class 1 to 10 Books

Biswaz Growth Academy: Free WBBSE Books & Study Materials

Welcome to biswaz.com, your premier destination for high-quality educational resources. Explore our comprehensive library of West Bengal Board (WBBSE) textbooks from Class 1 to Class 10. Whether you are looking for Amar Boi, Sahaj Path, Ganit Prabha, Butterfly, Bliss, or Amader Paribesh, we provide easily accessible PDF downloads to support student growth, learning, and exam preparation.

WBBSE Books PDF Download Class 1 to 10 Syllabus West Bengal Board Solutions Free School Textbooks Biswaz Educational Portal

Biswaz Growth

Academy Portal

Select a Class

0 items