দশম পাঠ (গদ্যাংশ)
এত রাত্রে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে কে? কেউ না, বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে। এখন অনেক রাত্রি। উল্লাপাড়ার মাঠে শেয়াল ডাকছে- হুক্কাহুয়া। রাস্তায় ও কি এক্কা গাড়ির শব্দ? না, মেঘ গুড়গুড় করছে। উল্লাস, তুমি যাও তো, কুকুরের বাচ্ছাটা বড়ো চেঁচাচ্ছে, ঘুমোতে দিচ্ছে না, ওকে শান্ত ক'রে এসো। ওটা কীসের ডাক উল্লাস? অশ্বত্থ গাছে পেঁচার ডাক। উচ্ছের খেত থেকে ঝিল্লি ওই ঝিঁ ঝিঁ করছে। দরজার পাল্লাটা বাতাসে ধড়াস ধড়াস করে পড়ছে, বন্ধ ক'রে দাও। ওটা কি কান্নার শব্দ? না, রান্নাঘর থেকে বিড়াল ডাকছে। যাও-না উল্লাস, থামিয়ে দিয়ে এসো গে। আমার ভয় করছে। বড়ো অন্ধকার। ভজ্জুকে ডেকে দিই। ছি ছি উল্লাস, ভয় করতে লজ্জা করে না। আচ্ছা, আমি নিজে যাচ্ছি। আর তো রাত নেই। পুব দিক উজ্জ্বল হয়েছে। ও ঘরে বিছানায় খুকি চঞ্চল হয়ে উঠল। বাঞ্ছাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দাও। বাঞ্ছা শীঘ্র আমার জন্যে চা আনুক আর কিঞ্চিৎ বিস্কুট। আমি ততক্ষণ মুখ ধুয়ে আসি। রক্ষামণি থাক্ খুকুর কাছে। তুমিও সাজসজ্জা ক'রে তৈরি থাকো উল্লাস। বেড়াতে যাব। উত্তম কথা। কিন্তু ঘাস ভিজে কেন? এক পত্তন বৃষ্টি হয়ে গেল বুঝি? এবার লন্ঠনটা নিবিয়ে দাও। আর মন্টুকে বলো, বারান্দা পরিষ্কার ক'রে দিক। এখনি রেভারেন্ড এন্ডারসন আসবেন। পণ্ডিত-মশায়েরও আসবার সময় হ'ল। ওই শোনো, কুণ্ডুদের বাড়ি ঢং ঢং করে ছটার ঘণ্টা বাজে।
দশম পাঠ (কবিতা)
আকাশ-পারে পুবের কোণে কখন যেন অন্যমনে ফাঁক ধরে ওই মেঘে, মুখের চাদর সরিয়ে ফেলে বন্ধ চোখের পাতা মেলে আকাশ ওঠে জেগে। ছিঁড়ে-যাওয়া মেঘের থেকে পুকুরে রোদ পড়ে বেঁকে, লাগায় ঝিলিমিলি। বাঁশ-বাগানের মাথায় মাথায় তেঁতুল গাছের পাতায় পাতায় হাসায় খিলিখিলি। হঠাৎ কীসের মন্ত্র এসে ভুলিয়ে দিলে এক নিমেষে বাদল-বেলার কথা। হারিয়ে-পাওয়া আলোটিরে নাচায় ডালে ফিরে ফিরে ফুলের লতা।।
পাঠের সারসংক্ষেপ
'দশম পাঠ'-এ একটি রাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন শব্দ (বাতাসের ধাক্কা, শেয়ালের ডাক, মেঘের গর্জন) এবং ভয় মেশানো পরিবেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। রাতের অন্ধকারের পর ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে দৈনন্দিন কাজ শুরু হওয়ার প্রস্তুতি দেখা যায়। এর সাথে যুক্ত কবিতাটিতে মেঘ কেটে যাওয়ার পর ভোরের আকাশ কীভাবে জেগে ওঠে, তার এক সুন্দর কাব্যিক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
লেখক পরিচিতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ছিলেন একজন বাঙালি কবি, লেখক, সুরকার, দার্শনিক এবং চিত্রশিল্পী। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীত এবং ভারতীয় শিল্পে আধুনিকতার প্রবর্তন করেন। তাঁর "গীতাঞ্জলি" কাব্যের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই পাঠটি তাঁর "সহজ পাঠ" বই থেকে নেওয়া হয়েছে, যা শিশুদের সহজ ও আনন্দদায়কভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
শব্দার্থ
- উল্লাস: এখানে একটি নাম, তবে এর অর্থ আনন্দ বা হর্ষ।
- অশ্বত্থ: এক প্রকার বড় গাছ, বটগাছের মতো।
- ঝিল্লি: ঝিঁ ঝিঁ পোকা।
- পাল্লা: দরজার কপাট।
- উজ্জ্বল: আলোকিত, ঝলমলে।
- কিঞ্চিৎ: সামান্য, অল্প।
- লন্ঠন: হারিকেন বা আলোর সরঞ্জাম।
- পণ্ডিত-মশায়: শিক্ষক।
১. সঠিক বিকল্পটি বেছে নাও
ক) উল্লাপাড়ার মাঠে কী ডাকছিল? i) কুকুর ii) শেয়াল iii) পেঁচা
উত্তর: ii) শেয়াল
খ) কবিতায় রোদ পুকুরে কীভাবে পড়ছিল? i) সোজা হয়ে ii) গোল হয়ে iii) বেঁকে
উত্তর: iii) বেঁকে
২. বাক্যগুলি সম্পূর্ণ করো
ক) অশ্বত্থ গাছে _________ ডাক।
উত্তর: পেঁচার
খ) বন্ধ চোখের পাতা মেলে _________ ওঠে জেগে।
উত্তর: আকাশ
৩. প্রশ্নগুলির উত্তর দাও
ক) কে কুকুরের বাচ্চাকে শান্ত করতে গিয়েছিল?
উত্তর: প্রথমে উল্লাসকে যেতে বলা হয়েছিল, কিন্তু পরে বক্তা নিজেই যাচ্ছিলেন।
খ) কবিতায় কীসের মন্ত্র এসে বাদল-বেলার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল?
উত্তর: কবিতায় ভোরের আলোর মন্ত্র এসে বাদল-বেলার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল।
৪. ব্যাকরণ (শব্দ দিয়ে বাক্য রচনা করো)
অন্ধকার, উজ্জ্বল, পরিষ্কার - এই শব্দগুলো দিয়ে একটি করে বাক্য লেখো।
উত্তর: অন্ধকার: রাত্রে চারিদিক অন্ধকার হয়ে যায়।
উজ্জ্বল: ভোরের আলোয় পুব দিক উজ্জ্বল দেখায়।
পরিষ্কার: মন্টু বারান্দা পরিষ্কার করছে।
৫. পাঠ নিয়ে কথোপকথন
বক্তা: উল্লাস, যাও তো, কুকুরের বাচ্চাটা খুব চেঁচাচ্ছে।
উল্লাস: বাইরে খুব অন্ধকার, আমার ভয় করছে।
বক্তা: ছি ছি, ভয় করতে লজ্জা করে না! আচ্ছা, আমিই যাচ্ছি।
উল্লাস: আর তো রাত নেই, পুব দিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
বক্তা: হ্যাঁ, এবার তুমিও তৈরি হয়ে নাও, বেড়াতে যাব।
পাঠের কুইজ
"দশম পাঠ" সম্পর্কে তোমার জ্ঞান পরীক্ষা করো। তোমাকে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শুভকামনা!
প্রশ্ন ১/১০
স্কোর: ০
প্রশ্ন এখানে আসবে।
কুইজ সম্পন্ন!
আপনার চূড়ান্ত স্কোর হলো:
০%