ত্রয়োদশ পাঠ (গদ্যাংশ)
উদ্ধব মণ্ডল জাতিতে সদ্গোপ। তার অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থা। ভূসম্পত্তি যা-কিছু ছিল ঋণের দায়ে বিক্রয় হয়ে গেছে। এখন মজুরি ক'রে কায়ক্লেশে তার দিনপাত হয়। এ দিকে তার কন্যা নিস্তারিণীর বিবাহ। বরের নাম বটকৃষ্ণ। তার অবস্থা মন্দ নয়। খেতের উৎপন্ন শস্য দিয়ে সহজেই সংসার-নির্বাহ হয়। বাড়িতে পূজা-অর্চনা ক্রিয়াকর্মও আছে। আগামী কাল উনিশে জ্যৈষ্ঠ বিবাহের দিন। বরযাত্রীর দল আসবে। তার জন্যে আহারাদির উদ্যোগ করা চাই। পাড়ার লোকে কিছু কিছু সাহায্য করেছে। অভাব তবু যথেষ্ট। পাড়ার প্রান্তে একটি বড়ো পুষ্করিণী। তার নাম পদ্মপুকুর। বর্তমান ভূস্বামী দুর্লভ-বাবুর পূর্বপুরুষদের আমলে এই পুষ্করিণী সর্বসাধারণে ব্যবহার করতে পেত। এমন-কি, গ্রামের গৃহস্থ বাড়ির কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রয়োজন উপস্থিত হ'লে মাছ ধ'রে নেবার বাধা ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি দুর্লভ-বাবু প্রজাদের সেই অধিকার বন্ধ ক'রে দিয়েছেন। অল্প কিছুদিন আগে খাজনা দিয়ে বৃন্দাবন জেলে তাঁর কাছ থেকে এই পুকুরে মাছ ধরবার স্বত্ব পেয়েছে। উদ্ধব এ সংবাদ ঠিকমতো জানত না। তাই সেদিন রাত্রি থাকতে উঠে পদ্মপুকুর থেকে একটা বড়ো দেখে রুই মাছ ধ'রে বাড়ি আনবার উপক্রম করছে। এমন সময় বিঘ্ন ঘটল। সেদিন দুর্লভ-বাবুর ছোটো কন্যার অন্নপ্রাশন। খুব সমারোহ ক'রে লোক খাওয়ানো হবে। তারি মাছ সংগ্রহের জন্য বাবুর কর্মচারী কৃত্তিবাস কয়েকজন জেলে নিয়ে সেই পুষ্করিণীর ধারে এসে উপস্থিত। দেখে, উদ্ধব এক মস্ত রুই মাছ ধরেছে। সেটা তখনি তার কাছ থেকে কেড়ে নিলে। উদ্ধব কৃত্তিবাসের হাতে পায়ে ধ'রে কাঁদতে লাগল। কোনো ফল হ'ল না। ধনঞ্জয় পেয়াদা তাকে বলপূর্বক ধ'রে নিয়ে গেল দুর্লভ-বাবুর কাছে। দুর্লভের বিশ্বাস ছিল যে, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অত্যাচারী ব'লে উদ্ধব তাঁর দুর্নাম করেছে। তাই তার উপরে তাঁর বিষম ক্রোধ। বললেন, "তুই মাছ চুরি করেছিস, তার দণ্ড দিতে হবে।” ধনঞ্জয়কে বললেন, "একে ধরে নিয়ে যাও। যতক্ষণ না দশ টাকা দণ্ড আদায় হয়, ছেড়ে দিয়ো না।” উদ্ধব হাত জোড় করে বললে, "আমার দশ পয়সাও নেই। কাল কন্যার বিবাহ। কাজ শেষ হয়ে যাক, তার পরে আমাকে শাস্তি দেবেন।” দুর্লভ-বাবু তার কাতর বাক্যে কর্ণপাত করলেন না। ধনঞ্জয় উদ্ধবকে সকল লোকের সম্মুখে অপমান ক'রে ধ'রে নিয়ে গেল। দুর্লভের পিসি কাত্যায়নী ঠাকরুন সেদিন অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণে অন্তঃপুরে উপস্থিত ছিলেন। উদ্ধবের স্ত্রী মোক্ষদা তাঁর কাছে কেঁদে এসে পড়ল। কাত্যায়নী দুর্লভকে ডেকে বললেন, "বাবা, নিষ্ঠুর হোয়ো না। উদ্ধবের কন্যার বিবাহে যদি অন্যায় কর, তবে তোমার কন্যার অন্নপ্রাশনে অকল্যাণ হবে। উদ্ধবকে মুক্তি দাও।” দুর্লভ পিসির অনুরোধ উপেক্ষা ক'রে চ'লে গেলেন। কৃত্তিবাসকে ডেকে কাত্যায়নী বললেন, “উদ্ধবের দণ্ডের এই দশ টাকা দিলাম। এখনি তাকে ছেড়ে দাও।” উদ্ধব ছাড়া পেলে। কিন্তু অপমানে লজ্জায় তার দুই চক্ষু দিয়ে জল পড়তে লাগল। পরদিন গোধূলি-লগ্নে নিস্তারিণীর বিবাহ। বেলা যখন চারটে তখন পাঁচজন বাহক উদ্ধবের কুটির-প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত। কেউ-বা এনেছে ঝুড়িতে মাছ, কেউ-বা এনেছে হাঁড়িতে দই, কারও হাতে থালায়-ভরা সন্দেশ, একজন এনেছে একখানি লাল চেলির শাড়ি। পাড়ার লোকের আশ্চর্য লাগল। জিজ্ঞাসা করলে, “কে পাঠালেন?” বাহকেরা তার কোনো উত্তর না ক'রে চ'লে গেল। তার কিছুক্ষণ পরেই কুটিরের সম্মুখে এক পাল্কি এসে দাঁড়াল। তার মধ্যে থেকে নেমে এলেন কাত্যায়নী ঠাকরুন। উদ্ধব এত সৌভাগ্য স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারত না। কাত্যায়নী বললেন, "দুর্লভ কাল তোমাকে অপমান করেছে, সে কথা তুমি মনে রেখো না। আমি তোমার কন্যাকে আশীর্বাদ ক'রে যাব, তাকে ডেকে দাও।” কাত্যায়নী নিস্তারিণীকে একগাছি সোনার হার পরিয়ে দিলেন। আর, তার হাতে একশত টাকার একখানি নোট দিয়ে বললেন, “এই তোমার যৌতুক।”
ত্রয়োদש পাঠ (কবিতা)
অঞ্জনা-নদী-তীরে চন্দনী গাঁয়ে পোড়ো মন্দিরখানা গঞ্জের বাঁয়ে জীর্ণ ফাটল-ধরা- এক কোণে তারি অন্ধ নিয়েছে বাসা কুঞ্জবিহারী। আত্মীয় কেহ নাই নিকট কী দূর, আছে এক লেজ-কাটা ভক্ত কুকুর। আর আছে একতারা, বক্ষেতে ধ'রে গুনগুন্ গান গায় গুঞ্জন-স্বরে। গঞ্জের জমিদার সঞ্জয় সেন দু-মুঠো অন্ন তারে দুই বেলা দেন। সাতকড়ি ভঞ্জের মস্ত দালান, কুঞ্জ সেখানে করে প্রত্যুষে গান। "হরি হরি” রব উঠে অঙ্গন-মাঝে, ঝন্ঝনি ঝন্ঝনি খঞ্জনি বাজে। ভঞ্জের পিসি তাই সন্তোষ পান, কুঞ্জকে করেছেন কম্বল দান।
পাঠের সারসংক্ষেপ
'ত্রয়োদש পাঠ'-এর গদ্যাংশে উদ্ধব মণ্ডল নামে এক দরিদ্র পিতার করুন কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যিনি কন্যার বিবাহের জন্য জমিদারের পুকুর থেকে মাছ ধরতে গিয়ে অপমানিত ও দণ্ডিত হন। কিন্তু জমিদারের পিসি কাত্যায়নীর মহানুভবতায় তিনি মুক্তি পান এবং কাত্যায়নী নিজে এসে তাঁর কন্যার বিবাহে আশীর্বাদ ও উপহার দিয়ে যান। কবিতাংশে কুঞ্জবিহারী নামে এক অন্ধ গায়কের সরল জীবনযাত্রার ছবি আঁকা হয়েছে, যে একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে ও অন্যের দয়ায় জীবন নির্বাহ করে।
লেখক পরিচিতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ছিলেন একজন বাঙালি কবি, লেখক, সুরকার, দার্শনিক এবং চিত্রশিল্পী। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীত এবং ভারতীয় শিল্পে আধুনিকতার প্রবর্তন করেন। তাঁর "গীতাঞ্জলি" কাব্যের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই পাঠটি তাঁর "সহজ পাঠ" বই থেকে নেওয়া হয়েছে, যা শিশুদের সহজ ও আনন্দদায়কভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
শব্দার্থ
- সদ্গোপ: এক হিন্দু জাতি।
- কায়ক্লেশে: অতি কষ্টে।
- পুষ্করিণী: পুকুর।
- ভূস্বামী: জমিদার।
- অন্নপ্রাশন: হিন্দু শিশুদের প্রথম ভাত খাওয়ার অনুষ্ঠান।
- দণ্ড: শাস্তি।
- উপেক্ষা: অবহেলা, অগ্রাহ্য করা।
- যৌতুক: বিবাহের সময় কন্যার জন্য দেওয়া উপহার।
- জীর্ণ: পুরোনো, ভাঙাচোরা।
- প্রত্যুষে: ভোরবেলা।
১. সঠিক বিকল্পটি বেছে নাও
ক) উদ্ধব মণ্ডলের কন্যার নাম কী? i) মোক্ষদা ii) কাত্যায়নী iii) নিস্তারিণী
উত্তর: iii) নিস্তারিণী
খ) অন্ধ গায়কের নাম কী? i) সঞ্জয় সেন ii) কুঞ্জবিহারী iii) সাতকড়ি ভঞ্জ
উত্তর: ii) কুঞ্জবিহারী
২. বাক্যগুলি সম্পূর্ণ করো
ক) আগামী কাল _________ জ্যৈষ্ঠ বিবাহের দিন।
উত্তর: উনিশে
খ) গঞ্জের জমিদার _________ সেন দু-মুঠো অন্ন তারে দুই বেলা দেন।
উত্তর: সঞ্জয়
৩. প্রশ্নগুলির উত্তর দাও
ক) দুর্লভ-বাবু উদ্ধবকে কী দণ্ড দিয়েছিলেন?
উত্তর: দুর্লভ-বাবু উদ্ধবকে দশ টাকা দণ্ড দিয়েছিলেন এবং টাকা না দেওয়া পর্যন্ত তাকে আটকে রাখতে বলেছিলেন।
খ) কাত্যায়নী ঠাকরুন নিস্তারিণীকে কী যৌতুক দিয়েছিলেন?
উত্তর: কাত্যায়নী ঠাকরুন নিস্তারিণীকে একগাছি সোনার হার এবং একশত টাকার একটি নোট যৌতুক দিয়েছিলেন।
৪. ব্যাকরণ (ক্রিয়াপদ খুঁজে বের করো)
পাঠের গদ্যাংশ থেকে পাঁচটি ক্রিয়াপদ (যে শব্দ দিয়ে কাজ করা বোঝায়) খুঁজে বের করো।
উত্তর: হয়ে গেছে, হয়, করা চাই, দিয়েছেন, ধরেছে, দিলেন।
৫. পাঠ নিয়ে কথোপকথন
কাত্যায়নী: বাবা দুর্লভ, নিষ্ঠুর হোয়ো না। উদ্ধবকে মুক্তি দাও।
দুর্লভ: ও মাছ চুরি করেছে, ওর দণ্ড পেতেই হবে।
কাত্যায়নী: ওর মেয়ের বিয়েতে অন্যায় করলে তোমার মেয়ের অকল্যাণ হবে।
(দুর্লভ উপেক্ষা করে চলে যায়)
কাত্যায়নী (কৃত্তিবাসকে): এই নাও দশ টাকা। এখনি উদ্ধবকে ছেড়ে দাও।
পাঠের কুইজ
"ত্রয়োদש পাঠ" সম্পর্কে তোমার জ্ঞান পরীক্ষা করো। তোমাকে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শুভকামনা!
প্রশ্ন ১/১০
স্কোর: ০
প্রশ্ন এখানে আসবে।
কুইজ সম্পন্ন!
আপনার চূড়ান্ত স্কোর হলো:
০%