একাদশ পাঠ (গদ্যাংশ)
ভক্তরামের নৌকো শক্ত কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি। ভক্তরাম সেই নৌকো সস্তা দামে বিক্রি করে। শক্তিনাথ-বাবু কিনে নেন। শক্তিনাথ আর মুক্তিনাথ দুই ভাই। যে পাড়ায় থাকেন তার নাম জেলেবস্তি। তাঁর বাড়ি খুব মস্ত। সামনে নদী, পিছনে বড়ো রাস্তা। তাঁর দারোয়ান শত্রু সিং আর আক্রম মিশ্র রোজ সকালে কুস্তি করে। শক্তিনাথ-বাবুর চাকরের নাম অক্রুর। তাঁর বড়ো ছেলের নাম বিক্রম। ছোটো ছেলের নাম শত্রুনাথ। শক্তিবাবু তাঁর নৌকো লাল রং ক'রে নিলেন। তার নাম দিলেন রক্তজবা। তিনি মাঝে মাঝে নৌকোয় করে কখনো তিস্তা নদীতে, কখনো আত্রাই নদীতে, কখনো ইচ্ছামতীতে বেড়াতে যান। একদিন অঘ্রান মাসে পত্র পেলেন, বিপ্রগ্রামে বাঘ এসেছে। শিকারে যাত্রা করলেন। সেদিন শুক্রবার। শুক্লপক্ষের চন্দ্র সবে অস্ত গেছে। আক্রম বন্দুক নিয়ে চলল। আর দুটো বল্লম ছিল। সিন্দুকে ছিল গুলি বারুদ। নদীতে প্রবল স্রোত। বেলা যখন দুই প্রহর, নৌকো নন্দগ্রামে পৌঁছোল। রৌদ্র ঝাঁ ঝাঁ করছে। এক ভদ্রলোক খবর দিলেন, কাছেই বন্দিপুরের বন, সেখানে আছে বাঘ। শক্তিবাবু আর আক্রম বাঘ খুঁজতে নামলেন। জঙ্গল ঘন হয়ে এল। ঘোর অন্ধকার। কিছু দূরে গিয়ে দেখেন, এক পোড়ো মন্দির। জনপ্রাণী নেই। শক্তিবাবু বললেন, এইখানে একটু বিশ্রাম করি। সঙ্গে ছিল লুচি, আলুর দম আর পাঁঠার মাংস। তাই খেলেন। আক্রম খেল চাটনি দিয়ে রুটি। তখন বেলা পড়ে আসছে। গাছের ফাঁক দিয়ে বাঁকা হয়ে রৌদ্র পড়ে। প্রকাণ্ড অর্জুন গাছের উপর কতকগুলো বাঁদর; তাদের লম্বা লেজ ঝুলছে। শক্তিবাবু কিছু দূর গিয়ে দেখলেন, একটা ছোটো সোঁতা। তাতে এক-হাঁটুর বেশি জল হবে না। তার ধারে বালি। সেই বালির উপর বড়ো বড়ো থাবার দাগ। নিশ্চয় বাঘের থাবা। শক্তিবাবু ভাবতে লাগলেন, কী করা কর্তব্য। অঘ্রান মাসের বেলা। পশ্চিমে সূর্য অস্ত গেল। সন্ধ্যা হ'তেই ঘোর অন্ধকার। কাছে তেঁতুল গাছ। তার উপরে দুজনে চড়ে বসলেন। গাছের গুঁড়ির সঙ্গে চাদর দিয়ে নিজেদের বাঁধলেন, পাছে ঘুম এলে প'ড়ে যান। কোথাও আলো নেই। তারা দেখা যায় না। কেবল অসংখ্য জোনাকি গাছে গাছে জ্বলছে। শক্তিবাবুর একটু নিদ্রা এসেছে এমন সময়ে হঠাৎ ধপ্ ক'রে একটা শব্দ হওয়াতে চমকে জেগে উঠলেন। দেখলেন, কখন বাঁধন আলগা হয়ে আক্রম নীচে পড়ে গেছে। শক্তিনাথ তাকে দেখতে তাড়াতাড়ি নেমে এলেন। হঠাৎ দেখেন, কাছেই অন্ধকারে দুটো চোখ জ্বল্ জ্বল্ করছে। কী সর্বনাশ! এ তো বাঘের চোখ। বন্দুক তোলবার সময় নেই। ভাগ্যে দুজনের কাছে দুটো বিজলি বাতির মশাল ছিল। সে দুটো যেমনি হঠাৎ জ্বালানো, অমনি বাঘ ভয়ে দৌড় দিলে। সে রাত্রি আবার দুজনের গাছে কাটল। পরের দিন সকাল হ'ল। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা মেলে না, যতই চলে জঙ্গল বেড়ে যায়। গায়ে কাঁটার আঁচড় লাগে। রক্ত পড়ে। খিদে পেয়েছে। তেষ্টা পেয়েছে। এমন সময় মানুষের গলার শব্দ শোনা গেল। এক দল কাঠুরিয়া কাঠ কাটতে চলেছে। শক্তিবাবু বললেন, “তোমাদের ঘরে নিয়ে চলো। রাস্তা ভুলেছি। কিছু খেতে দাও। নদীর ধারে একটা ঢিবির 'পরে তাঁদের কুঁড়েঘর। গোলপাতা দিয়ে ছাওয়া। কাছে একটা মস্ত বট গাছ। তার ডাল থেকে লম্বা লম্বা ঝুরি নেমেছে। সেই গাছে যত রাজ্যের পাখির বাসা। কাঠুরিয়ারা শক্তিবাবুকে, আক্রমকে যত্ন ক'রে খেতে দিলে। তালপাতার ঠোঙায় এনে দিলে চিঁড়ে আর বনের মধু। আর দিলে ছাগলের দুধ। নদী থেকে ভাঁড়ে করে এনে দিলে জল। রাত্রে ভালো ঘুম হয়নি। শরীর ছিল ক্লান্ত। শক্তিবাবু বটের ছায়ায় শুয়ে ঘুমোলেন। বেলা যখন চার প্রহর তখন কাঠুরিয়াদের সর্দার পথ দেখিয়ে নৌকোয় তাঁদের পৌঁছিয়ে দিলে। শক্তিবাবু দশ টাকার নোট বের করে বললেন, "বড়ো উপকার করেছ, বকশিশ লও।” সর্দার হাত জোড় করে বললে, "মাপ করবেন, টাকা নিতে পারব না, নিলে অধর্ম হবে। এই বলে নমস্কার করে সর্দার চলে গেল।
একাদশ পাঠ (কবিতা)
একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু- “চেয়ে দেখো” “চেয়ে দেখো" বলে যেন বিনু। চেয়ে দেখি, ঠোকাঠুকি বরগা-কড়িতে, কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে। ইঁটে-গড়া গন্ডার বাড়িগুলো সোজা চলিয়াছে, দুদ্দাড় জানালা দরোজা। রাস্তা চলেছে যত অজগর সাপ, পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপধাপ্। দোকান বাজার সব নামে আর উঠে, ছাদের গায়েতে ছাদ মরে মাথা কুটে।
পাঠের সারসংক্ষেপ
'একাদশ পাঠ'-এ শক্তিনাথ-বাবু নামের এক ব্যক্তির साहসিক অভিযানের গল্প বলা হয়েছে। তিনি 'রক্তজবা' নামের নৌকোয় করে বাঘ শিকার করতে যান। জঙ্গলে প্রবেশ করে তাঁরা পথ হারিয়ে ফেলেন এবং বাঘের মুখোমুখি হন। বিজলি বাতির আলোয় বাঘ তাড়িয়ে তাঁরা কোনোমতে রাত কাটান। পরদিন সকালে একদল দয়ালু কাঠুরিয়ার সাহায্যে তাঁরা খাবার ও পথের সন্ধান পান। কাঠুরিয়াদের সর্দার পারিশ্রমিক হিসেবে টাকা নিতে অস্বীকার করে, যা তার মহৎ চরিত্রের পরিচয় দেয়।
লেখক পরিচিতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ছিলেন একজন বাঙালি কবি, লেখক, সুরকার, দার্শনিক এবং চিত্রশিল্পী। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীত এবং ভারতীয় শিল্পে আধুনিকতার প্রবর্তন করেন। তাঁর "গীতাঞ্জলি" কাব্যের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই পাঠটি তাঁর "সহজ পাঠ" বই থেকে নেওয়া হয়েছে, যা শিশুদের সহজ ও আনন্দদায়কভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
শব্দার্থ
- তক্তা: কাঠের পাটাতন।
- মস্ত: খুব বড়।
- কুস্তি: মল্লযুদ্ধ।
- অঘ্রান: অগ্রহায়ণ মাস, বাংলা মাস।
- প্রহর: দিনের বা রাতের ভাগ, তিন ঘন্টায় এক প্রহর।
- সোঁতা: সরু জলধারা।
- কর্তব্য: যা করা উচিত।
- বকশিশ: পারিশ্রমিক বা পুরস্কার।
১. সঠিক বিকল্পটি বেছে নাও
ক) শক্তিবাবুর নৌকোর নাম কী ছিল? i) জলপরী ii) রক্তজবা iii) ময়ূরপঙ্খী
উত্তর: ii) রক্তজবা
খ) কাঠুরিয়ারা শক্তিবাবুকে কী খেতে দিয়েছিল? i) ভাত-মাংস ii) রুটি-তরকারি iii) চিঁড়ে আর বনের মধু
উত্তর: iii) চিঁড়ে আর বনের মধু
২. বাক্যগুলি সম্পূর্ণ করো
ক) শক্তিনাথ আর _________ দুই ভাই।
উত্তর: মুক্তিনাথ
খ) কাছেই _________ বন, সেখানে আছে বাঘ।
উত্তর: বন্দিপুরের
৩. প্রশ্নগুলির উত্তর দাও
ক) শক্তিবাবু ও আক্রম কীভাবে বাঘের হাত থেকে রক্ষা পেলেন?
উত্তর: তাঁরা হঠাৎ বিজলি বাতির মশাল জ্বালানোয় বাঘ ভয়ে দৌড় দিয়েছিল।
খ) কাঠুরিয়াদের সর্দার বকশিশ নিতে অস্বীকার করল কেন?
উত্তর: কারণ সর্দার মনে করত টাকা নিলে অধর্ম হবে।
৪. ব্যাকরণ (নামবাচক শব্দ খুঁজে বের করো)
পাঠ থেকে পাঁচটি নামবাচক শব্দ (ব্যক্তি, স্থান বা নদীর নাম) খুঁজে বের করো।
উত্তর: শক্তিনাথ, আক্রম, তিস্তা, নন্দগ্রাম, বন্দিপুর।
৫. পাঠ নিয়ে কথোপকথন
শক্তিবাবু: আক্রম, বালির উপর ওগুলো কিসের দাগ? বড়ো বড়ো থাবার দাগ মনে হচ্ছে!
আক্রম: হ্যাঁ বাবু, ওটা নিশ্চয়ই বাঘের থাবা।
শক্তিবাবু: সন্ধ্যা হয়ে এল, এখন কী করা কর্তব্য? চলো, ওই তেঁতুল গাছে উঠে রাতটা কাটাই।
আক্রম: ঠিক বলেছেন। নিজেদের চাদর দিয়ে বেঁধে নিতে হবে, নইলে ঘুম এলে পড়ে যেতে পারি।
পাঠের কুইজ
"একাদশ পাঠ" সম্পর্কে তোমার জ্ঞান পরীক্ষা করো। তোমাকে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শুভকামনা!
প্রশ্ন ১/১০
স্কোর: ০
প্রশ্ন এখানে আসবে।
কুইজ সম্পন্ন!
আপনার চূড়ান্ত স্কোর হলো:
০%